নতুন বছরের অঙ্গীকার এবং হযরত আলীর নৈতিক শিক্ষা

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 7 d ago
ইরাকের পবিত্র শহর কারবালায় অবস্থিত হযরত আলীর দরগাহ
ইরাকের পবিত্র শহর কারবালায় অবস্থিত হযরত আলীর দরগাহ
ছানিয়া আঞ্জুম

নতুন বছরকে সাধারণত নতুন সূচনা, নতুন সংকল্প এবং নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে অনেকের কাছে এই বছরটি উদযাপনের বাইরেও একটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি ইসলামি ইতিহাসের এক সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের জন্মবার্ষিকীর সঙ্গেও যুক্তযাঁর জীবন ন্যায়, সাহস ও নৈতিক নেতৃত্বের যুগান্তকারী শিক্ষা প্রদান করে। নতুন বছরের প্রথম দিনে তাঁকে স্মরণ করা আমাদের এই চিন্তায় বাধ্য করে যে, প্রকৃত নবায়ন শুধু পরিবর্তন থেকেই শুরু হয় না; বরং আমাদের সিদ্ধান্তকে পরিচালিত করা মূল্যবোধ থেকেই তার সূচনা হয়।

১লা জানুয়ারিকে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ দিন মানুষ উদযাপন করে, নতুন সংকল্প গ্রহণ করে এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। তবে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলমানের কাছে এই দিনটির রয়েছে অতিরিক্ত গুরুত্ব। কারণ এটি ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর জন্মজয়ন্তী। ১ জানুয়ারিতে তাঁকে স্মরণ করা মানুষকে কেবল লক্ষ্য ও সাফল্যের মাধ্যমে নতুন শুরুর ধারণায় আবদ্ধ না রেখে, বরং জীবনের প্রকৃত দিশা নির্ধারণকারী মূল্যবোধ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে অনুপ্রাণিত করে।

হযরত আলী (রা.) ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আত্মীয় ভ্রাতা, জামাতা এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা। তিনি শুধু নবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই স্মরণীয় নন, বরং তাঁর অসামান্য ভূমিকার জন্যও স্মরণ করা হয়। তিনি তাঁর সাহস, জ্ঞান ও গভীর ন্যায়বোধের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবনে শক্তি ও দয়া, ক্ষমতা ও নম্রতার মধ্যে এক অনন্য ভারসাম্য পরিলক্ষিত হয়।তাঁর উত্তরাধিকার আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা নৈতিক নেতৃত্ব ও নৈতিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেযে বিষয়গুলো নিয়ে সমাজ আজও সংগ্রাম করে চলেছে।


হযরত আলীর দরগাহ

১লা জানুয়ারি সাধারণত পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হলেও, এটি থেমে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনার এক বিরল মুহূর্তও এনে দেয়। নতুন বছরের শুরুতে আমরা আসলে কী ধরনের পরিবর্তন চাই? কেবল বস্তুগত অগ্রগতি, নাকি চরিত্রের রূপান্তরও? এই দিনে হযরত আলী (রা.)-এর জীবনের দিকে তাকালে বাহ্যিক সাফল্য থেকে মনোযোগ সরে যায় অন্তর্গত উন্নতির দিকে। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়অর্থবহ পরিবর্তন কেবল লক্ষ্য থেকে নয়, মূল্যবোধ থেকেই শুরু হয়।

ন্যায় ছিল হযরত আলী (রা.)-এর জীবন ও নেতৃত্বদর্শনের ভিত্তি। শাসক হিসেবে তিনি মর্যাদা বা প্রভাব নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে দেখতেন বলে পরিচিত ছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে, তিনি অন্যকে প্রশ্ন করার আগে নিজেকেই জবাবদিহির আওতায় আনতেনসততার এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা আজও বিরল। ন্যায় সম্পর্কে তাঁর ধারণা কেবল আইন বা শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ন্যায্যতা, সহানুভূতি ও নৈতিক সাহস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমন এক সময়ে, যখন জনপরিসরের বক্তৃতায় বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রাধান্য পায়, তখন তাঁর জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেব্যক্তিগত সততা ছাড়া কি ন্যায় টিকে থাকতে পারে? তাঁর কর্মের মধ্য দিয়েই হযরত আলী (রা.) সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়ে গেছেন।


হযরত আলীর দরগাহ

যদিও তাঁকে প্রায়ই তাঁর সাহসের জন্য স্মরণ করা হয়, হযরত আলী (রা.) ছিলেন একজন গভীর চিন্তাবিদ ও শিক্ষকও। তাঁর বাণীতে মানবস্বভাব, আত্মসংযম এবং জ্ঞান অর্জনের গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রতিফলিত হয়। তিনি ক্রোধের মুহূর্তে ধৈর্য এবং সাফল্যের মুহূর্তে বিনয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেনতাঁর একটি চিরন্তন বার্তা হলোপ্রকৃত শক্তি অন্যকে পরাজিত করার মধ্যে নয়, বরং নিজের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই নিহিতঅবিরাম কোলাহল, ত্বরিত প্রতিক্রিয়াঅনলাইন সংঘাতে ভরা এই যুগে তাঁর এই জ্ঞান বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়

চাপঅনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য হযরত আলী (রা.)-এর শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণঅনুমোদনের বদলে আন্তরিকতা এবং জনপ্রিয়তার পরিবর্তে উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁর জীবন সাফল্যের এক ভিন্ন ধারণা উপস্থাপন করেতিনি মর্যাদার চেয়ে জ্ঞানকে এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে নৈতিকতাকে অধিক মূল্য দিয়েছিলেন। যারা নিজেদের দিশা সম্পর্কে অনিশ্চিত অবস্থায় নতুন বছর শুরু করছেন, তাঁদের জন্য তাঁর আদর্শ সময় ও শ্রম আসলে কোন কাজে ব্যয় করা উচিতসে বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে ।

হযরত আলীর দরগাহ

হযরত আলী (রা.)-এর বাণী কেবল কোনো এক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামে তিনি বিশেষ মর্যাদা লাভ করলেও তাঁর নীতিসমূহ সার্বজনীন। ন্যায়, দয়া, সততা ও বিনয়এগুলো এমন মূল্যবোধ, যা সব সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে সমানভাবে স্বীকৃত। এ কারণেই ১ জানুয়ারি বিভিন্ন পটভূমির মানুষের জন্য মানবতা ও নৈতিক স্পষ্টতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক উত্তরাধিকার নিয়ে একসঙ্গে ভাবার সুযোগ করে দেয়

নতুন বছর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছে জিজ্ঞেস করা জরুরিআমরা আমাদের সঙ্গে কী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি? পরিকল্পনাপ্রতিশ্রুতির বাইরে, কঠিন সময়ে কোন মূল্যবোধ আমাদের সিদ্ধান্তকে পথ দেখাবে? ১ জানুয়ারিতে হযরত আলী (রা.)-এর জন্মদিন স্মরণ করা মানুষকে তাদের সংকল্পকে নৈতিকতার সঙ্গে এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দায়িত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে অনুপ্রাণিত করে। এটি আমাদের শুধু কী অর্জন করতে চাই তা নয়, বরং আমরা কীভাবে জীবন বেছে নিতে চাইসেটিও ভাবতে শেখায়।

১লা জানুয়ারি ও হযরত আলী (রা.)-এর জন্মের এই কাকতালীয় মিল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নতুন সূচনা তখনই সবচেয়ে অর্থবহ হয়, যখন তা মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বছর এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তাঁর ন্যায়, প্রজ্ঞা, সাহস ও মমতায় ভরা জীবন থেকে প্রেরণা নিতে পারে।নতুন বছরটি যেন শুধু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নয়, চরিত্রের মাধ্যমেও সংজ্ঞায়িত হয়; শুধু অগ্রগতির দ্বারা নয়, নীতির দ্বারাও গঠিত হয়যখন আত্মপর্যালোচনা আমাদের পথ দেখায়, তখন আগামীর যাত্রা আরও স্পষ্ট এবং আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে