আওয়াজ–দ্যা ভয়েস ব্যুরো
নগাঁও জেলার বটদ্রবায় আজ কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন বহুল প্রতীক্ষিত বরদোয়া প্রকল্প। এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রায় ১৫০ জন সত্ৰাধিকাৰ উপস্থিত ছিলেন। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ৬০ হাজার ভক্ত ও বৈষ্ণবের সমাগমে বটদ্রবা হয়ে ওঠে এক বিশাল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র। এই প্রকল্পকে নান্দনিক ও আকর্ষণীয় করে তোলার পেছনে রয়েছেন তিনজন অসমীয় মুসলমান শিল্পী। তাঁরা হলেন, পিতা নুরুদ্দিন আহমেদ এবং তাঁর দুই পুত্র দ্বীপ আহমেদ ও রাজ আহমেদ। রাজ আহমেদ ও দ্বীপ আহমেদ অনেকের কাছেই হয়তো অপরিচিত নাম, কিন্তু শিল্পী ও কলা-নির্দেশক নুরুদ্দিন আহমেদ অসমের এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।
শিল্পী নুরুদ্দিন আহমেদের যোগ্য পুত্র রাজ আহমেদ ভাগবত, কীর্তন ও চিত্র ভাগবত গভীরভাবে অধ্যয়ন করে এবং বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে গুরুজনার জন্মভূমি বরদোয়ায় নির্মিত বরদোয়া প্রকল্পে গুরু আসন, কৃষ্ণলীলা ও ভগবান বিষ্ণুর দশাবতারের ভাস্কর্য নির্মাণ করে সেগুলিকে যেন জীবন্ত রূপ দিয়েছেন। দুই বছর ধরে একটানা পরিশ্রম করে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের জন্মস্থান তথা হিন্দু-বৈষ্ণবদের পবিত্র তীর্থভূমিতে গুরুজনার আরাধিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রায় জীবন্ত রূপে প্রকাশ করতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেন রাজ আহমেদ ও তাঁর ভাই দ্বীপ আহমেদ।
শিল্পী নুরুদ্দিন আহমেদ আর তাঁর দুই পুত্রের হাতে তৈরি বরদোয়ার প্রকল্পের দৃশ্য (বামে) ও পুত্র রাজ আহমেদ (ডানে)
অসমের বর্তমান ‘চেনা–অচেনা’ পরিবেশে কলা-নির্দেশক নুরুদ্দিন আহমেদ এবং তাঁর দুই কৃতী পুত্র বৈষ্ণব সংস্কৃতির জনক ও সমাজসংস্কারক শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের সৃষ্টিকে তাঁর জন্মস্থানে প্রাণ দেওয়ার যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অকুণ্ঠ প্রশংসার যোগ্য। এটি কেবল বর্তমান সামাজিক–রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নয়, বরং এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যখন মহাপুরুষের মহাপ্রয়াণের ৪৫৭ বছর পর তাঁর অবদান বিস্মৃতপ্রায় হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নুরুদ্দিন আহমেদ ও তাঁর দুই পুত্র রাজ ও দ্বীপের এই প্রচেষ্টা শুধু গুরুজনাকেই নয়, তিনি যাঁর বন্দনা করেছেন সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর আবির্ভাব থেকে মহাপ্রয়াণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ জীবন এবং ভগবান বিষ্ণুর দশাবতারকে বৈষ্ণব সংস্কৃতির পীঠস্থান অসমে আগামী বহু প্রজন্মের কাছে জীবন্ত ও পরিচিত করে তুলবে।
মহাপুরুষের বর্ণনায় জীবন্ত ও আরাধ্য হয়ে ওঠা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র কিংবা বৈষ্ণব দর্শন তাঁর প্রয়াণের সাড়ে চারশো বছর পরে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে। কিন্তু বর্তমান রাজ্য সরকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বরদোয়া প্রকল্প এবং সেই প্রকল্পে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর লীলাকে প্রায় জীবন্ত রূপে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নুরুদ্দিন আহমেদ ও তাঁর দুই পুত্রের অক্লান্ত সাধনা আবারও অসমভূমিতে বৈষ্ণব দর্শনের গভীর প্রভাব ফেলবে, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
যদিও আজ প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে, তবুও ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। তবে অধিকাংশ কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, যার জন্য তাঁদের টানা দুই বছর নিরলস পরিশ্রম করতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ বরদোয়া প্রকল্প উদ্বোধনের আগের দিন, অর্থাৎ রবিবার, রাজ আহমেদ ও দ্বীপ আহমেদ ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হওয়া ভাস্কর্যগুলিতে শেষ স্পর্শ দেন, যেমন দুর্গাপুজোর আগে দেবীর প্রতিমায় শেষ তুলির টান দেওয়া হয়।
শিল্পী নুরুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে এক কথোপকথনে তিনি আওয়াজ–দ্যা ভয়েসকে বলেন, “প্রায় দুই বছর ধরে আমরা এই প্রকল্পের কাজ করে চলেছি। ২০০ বিঘারও বেশি জমি জুড়ে এই প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এখনও কিছু কাজ বাকি আছে, কিন্তু মহাপুরুষের সৃষ্টিরাজি ইতিমধ্যেই প্রকল্পস্থলে ফুটে উঠেছে। গুরুজনার প্রতিষ্ঠিত আদর্শ অনুযায়ী বিশাল আকারে গুরু আসন নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে। ভগবান বিষ্ণুর দশাবতার, মৎস্য, কূর্ম, নরসিংহ, বামন, পরশুরাম, শ্রীরাম, বরাহ, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ ও কল্কি, সবগুলির নির্মাণ শেষ হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা মূর্তির মাধ্যমে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তাঁর জন্ম থেকে শুরু করে নানা লীলা মূর্তির রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের পদযুগল, নবরস, ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের প্রধান ভক্ত হনুমান, গরুড়, সবই নির্মাণ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মূলত শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের চিত্র ভাগবত থেকেই আমরা সমস্ত নকশা ও ধারণা নিয়েছি। একটি ভগবান-মূর্তিকে সঠিক রূপ দিতে ভাগবত ও কীর্তন গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছি। সাঁচিপাতের পুথি থেকেও বহু ধারণা নেওয়া হয়েছে। শঙ্করদেব কলাক্ষেত্র প্রকাশিত চিত্র ভাগবত আমাদের প্রধান সহায়ক হয়েছে। এটি শুধু ধর্মগ্রন্থ পাঠ নয়, বরং এক ধরনের গবেষণালব্ধ শিল্পকর্ম। আমার দুই পুত্রই ভাগবত, চিত্র ভাগবত, কীর্তন ও সাঁচিপাতের পুথি ভালোভাবে অধ্যয়ন করেছে। বড় ছেলে রাজ আহমেদ ধর্মীয় শিল্পকলায় পারদর্শী, আর ছোট ছেলে দ্বীপ আহমেদ আধুনিক ভাস্কর্য নির্মাণে বিশেষ দক্ষ।”
বরদোয়ার প্রকল্প
উল্লেখযোগ্য যে, নুরুদ্দিন আহমেদ ও তাঁর দুই পুত্র দেব-দেবীর মূর্তিগুলি এমনভাবে নির্মাণের চেষ্টা করেছেন, যাতে সেগুলি দর্শকদের চোখে জীবন্ত বলে মনে হয়। নির্মাণে ফাইবার গ্লাস ও মার্বেল ডাস্ট ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু দেব-দেবীর মূর্তিই নয়, বরদোয়া প্রকল্পে অসমের গ্রামীণ জীবন, বড়ো, রাভা, মিসিং, দেউরী, তিওয়া, কার্বি-সহ সব জনগোষ্ঠীর জীবনধারাকেও তুলে ধরা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক অসমের সমাজজীবনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল প্রকল্প দর্শনার্থীদের কাছে গুরুজনার প্রায় সমগ্র কর্মজীবন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য, সনাতন ধর্ম ও অসমের সামগ্রিক জনজীবন হৃদয়ঙ্গম করার এক অনন্য সুযোগ করে দেবে। এই প্রকল্পের অংশ হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন শিল্পী।
উল্লেখযোগ্য যে, কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ সোমবার দিনভর কর্মসূচি নিয়ে অসম সফরে এসে বরদোয়া প্রকল্প উদ্বোধনের পাশাপাশি একাধিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এর আগে রবিবার রাতে আহমেদাবাদ থেকে গুয়াহাটিতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচলে সমস্যা হওয়ায় তাঁর সফর সোমবারে পিছিয়ে দেওয়া হয়।
গৃহমন্ত্রী তাঁর সফরের শুরুতেই নতুনভাবে নির্মিত ‘শহীদ স্মারক ক্ষেত্র’-এ অসম আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর তিনি নগাঁও জেলার বরদোয়া থান, বৈষ্ণব সন্ত শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের জন্মস্থান, এ গিয়ে ২২৭ কোটি টাকার অভিলাষী প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। বরদোয়ার অনুষ্ঠান শেষে তিনি গুয়াহাটিতে ফিরে ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গুৱাহাটী পুলিশ কমিশনারেটের নতুন ভবন এবং মহানগরীর নিরাপত্তা জোরদার করতে ১৮৯ কোটি টাকার ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (ICCC) উদ্বোধন করবেন।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানান, রাজ্যের নিরাপত্তা ও জরুরি সাড়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ICCC-এর মাধ্যমে গুয়াহাটিতে ২০০০-এরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই দিনে নতুন দিল্লি রওনা হওয়ার আগে অমিত শাহ গুয়াহাটিতে ৫ হাজার আসনবিশিষ্ট ২৯১ কোটি টাকার ‘জ্যোতি বিষ্ণু সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স’ প্রেক্ষাগৃহেরও উদ্বোধন করবেন।