আজমের শরিফে মানবতার সমাবেশ: ৮১৪তম উরসে শান্তি, প্রার্থনা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের ডাক

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 d ago
আজমের শরিফে ৮১৪তম উরসে
আজমের শরিফে ৮১৪তম উরসে
 
আজমের

আজমের শরিফে হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ.)–এর ৮১৪তম বার্ষিক উরস মোবারক শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এই পবিত্র উপলক্ষে এক মিলিয়নেরও বেশি ভক্ত প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। উরসের মূল বার্তা ছিল; আশা, শান্তি ও মানবিক ভ্রাতৃত্ব।
 
আজমের শরিফ দরগাহর গদ্দি নশিন ও চিশতী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাজি সৈয়দ সালমান চিশতী বলেন, “সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই, যিনি আজমের শরিফকে এক  মিলিয়নেরও বেশি সাধক ও অন্বেষীর উপস্থিতিতে ধন্য করেছেন। তারা বিনয়, প্রার্থনা ও ভালোবাসা নিয়ে এখানে সমবেত হয়েছেন; যা ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা ও সংস্কৃতির সব সীমার ঊর্ধ্বে।”
তিনি আরও বলেন, “এই উরস কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণ নয়; এটি মানবতার জন্য এক জীবন্ত প্রার্থনা, এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব নৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আট শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আজমের শরিফ একটি আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল হিসেবে বিরাজ করছে, যেখানে আহত হৃদয় সান্ত্বনা পায়, বিভক্ত আত্মা ঐক্য খুঁজে পায় এবং মানবতা তার অভিন্ন নৈতিক দিশা পুনরাবিষ্কার করে।”
 
সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দরগাহে চাদর পেশ করে প্রার্থনা করেন। খাজা গরিব নওয়াজ (রহ.)–এর সর্বজনীন বার্তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে চিশতী বলেন, “সবার প্রতি ভালোবাসা, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়’, এটি কোনো এক সম্প্রদায়ের জন্য নয়; এটি এমন এক সার্বজনীন নীতি, যা আরোগ্যের জন্য আকুল এক বিশ্বকে পথ দেখায়। প্রার্থনার পবিত্র নীরবতা ও সম্মিলিত ভক্তির নিঃশ্বাসে এই উরস আবারও প্রমাণ করেছে, সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা বিভাজন নয়, ঐক্য সৃষ্টি করে।”
তিনি ২০২৫ সালের নানা চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন; সন্ত্রাসী হামলা, সহিংসতা, ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ এবং বিশ্বজুড়ে সামাজিক সম্প্রীতির ওপর হুমকি। 
 
উরস উপলক্ষে সুফি সংগীত ও কাওয়ালির মনোমুগ্ধকর পরিবেশনাও অনুষ্ঠিত হয়। চিশতী বলেন, “আজমের শরিফের আধ্যাত্মিক হৃদয় থেকে আমরা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য আন্তরিক প্রার্থনা জানাই; পাশাপাশি বিশ্বের সব সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্যও। সন্ত্রাস, সহিংসতা ও অবিচারে বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর জন্য; ভয় ও ভ্রান্ত তথ্যের ভিড়ে যারা সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করতে লড়াই করছে, সবার জন্য আমাদের দোয়া। বেদনা কোনো এক বিশ্বাসের একার নয়; একটি সম্প্রদায়ের দুঃখ মানে সমগ্র মানবতার দুঃখ।”
 
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিশ্বাস মানুষের হৃদয় আরোগ্য করবে, কঠোর করবে না। ধর্মের কাজ জীবন রক্ষা করা, রাজনীতিকরণ নয়। আর প্রকৃত ভক্তির মাপকাঠি হলো করুণাকে কাজে রূপ দেওয়া। আমাদের সম্মিলিতভাবে সেই সব বয়ান প্রত্যাখ্যান করতে হবে, যা বিশ্বাসকে ভয়ে এবং পরিচয়কে অস্ত্রে পরিণত করে।”
 
সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু আজমের শরিফের উরসে
 
তিনি ২০২৬ সালকে আশার ও নৈতিক সাহসের বছর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “২০২৬ হোক, ন্যায়ের ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত শান্তির বছর, আধিপত্যের নয়; বিভাজনের বদলে সংলাপের বছর; চরমপন্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার জয়; স্বার্থপরতার ওপর সেবার বিজয়। সরকার, আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজ, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে মানব সভ্যতার নৈতিক কেন্দ্র পুনরুদ্ধারের জন্য।”
 
শেষে তিনি প্রার্থনা করেন, “যেখানে ঘৃণা বাসা বেঁধেছে, সেখানেই হৃদয় নরম হোক! বিরোধের জায়গায় সংলাপ আসুক! ন্যায় যেন করুণার হাত ধরে পথ চলে! মানবতা যেন তার অভিন্ন আত্মাকে নতুন করে খুঁজে পায়! আজমের শরিফের এই পবিত্র প্রান্তর থেকে, যেখানে সাধকেরা শর্তহীনভাবে মানবতাকে আলিঙ্গন করেছিলেন, বিশ্ব শান্তি, করুণা ও সম্প্রীতির জন্য এই প্রার্থনা উত্থিত হোক।”