আওয়াজ দ্য ভয়েস, নয়াদিল্লি
রাজনৈতিক মঞ্চে দেশের মুসলমানদের অবহেলা করা হতে পারে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সম্মানজনক। স্বাধীন ভারতের নির্মাণে মুসলিম ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ।
শুধু দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ হয়ে ওঠাই নয়, চিকিৎসা, চামড়া, ফ্যাশন এবং সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের দখল আজও শক্তিশালী এবং অসাধারণ। এই উদ্যোগগুলিতে মুসলিমদের অবদান শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে ভারতকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে এবং দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। তাদের কঠোর পরিশ্রম, উদ্ভাবন এবং ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করেছে যে তারা অর্থনৈতিক সফলতার ক্ষেত্রে অগ্রণী। এমন ১০ জন মুসলিম উদ্যোক্তার কথা এই প্রতিবেদনে আলোচনা করতে চাই, যারা দেশের সমৃদ্ধির প্রেরণা এবং যাদের ছাড়া ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
১. আজিম প্রেমজি:
আজিম প্রেমজি একজন বিখ্যাত ভারতীয় উদ্যোক্তা, দানশীল ব্যক্তি এবং শিক্ষা সংস্কারক। ১৯৪৫ সালের ২৪ জুলাই মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণকারী আজিম প্রেমজি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন,যদিও পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি উইপ্রোর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
আজিম প্রেমজি
প্রথমদিকে এই কোম্পানিটি বনস্পতি তেল উৎপাদন করত, কিন্তু প্রেমজি এটিকে একটি বিশ্বব্যাপী আইটি এবং সফটওয়্যার পরিষেবা কোম্পানিতে রূপান্তরিত করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব উইপ্রোকে ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিতে পরিণত করেছে ।
সমাজসেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে অতুলনীয় অবদানের জন্য আজিম প্রেমজি বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি ২০০১ সালে ভারতের দুর্গম অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করা আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।এ পর্যন্ত সমাজসেবায় কোটি কোটি টাকা অনুদান প্রদানকারী আজিম প্রেমজি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দানশীল ব্যক্তিদের মধ্যে একজন।ভারত সরকার তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য পদ্ম ভূষণ (২০০৫) এবং পদ্ম বিভূষণ (২০১১) সম্মানে ভূষিত করেছে।আজিম প্রেমজি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন,বরং সরলতা,সততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য অনুপ্রেরণা
২. শাহনাজ হুসেইন:
ভারতের একজন বিখ্যাত সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা শাহনাজ হুসেইনকে বনৌষধি ও আয়ুর্বেদিক সৌন্দর্য সামগ্রীর জগতে এক বিপ্লবী পরিবর্তন আনার কৃতিত্ব দেওয়া হয়।১৯৪৪ সালের ৫ নভেম্বর এলাহাবাদে একটি প্রতিষ্ঠিত বিচারিক পরিবারে তাঁর জন্ম হয়।মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এবং ১৬ বছর বয়সে মা হওয়ার পরেও শাহনাজ হুসেইন ইরান, লন্ডন, প্যারিস, আমেরিকার মতো দেশে সৌন্দর্যচর্চার শিক্ষা গ্রহণ করেন ।
শাহনাজ হুসেইন
শাহনাজ হুসেইন ১৯৭১ সালে দিল্লির নিজ বাড়ি থেকেই একটি ছোট বনৌষধি চিকিৎসালয় শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তে বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তৈরি করা কেশর-ভিত্তিক ত্বক উজ্জ্বলকরণ পণ্যটি আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর কোম্পানি শাহনাজ হুসেইন গ্রুপ আজ ১০০টিরও বেশি দেশে উপলব্ধ,এবং তাঁর হাতে রয়েছে ৩৮০টিরও বেশি বনৌষধি সূত্র। ২০০৬ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভকারী শাহনাজ হুসেইন হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড,এলএসই-এর মতো প্রতিষ্ঠানে ভাষণ প্রদান করেছেন। শাহনাজ হুসেইন শুধু ভারতীয় আয়ুর্বেদকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছেন তা নয়, নারীদের জন্যও এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।
৩. হাকিম আব্দুল হামিদ:
হাকিম আব্দুল হামিদ ইউনানি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে শুধু পুনর্জীবিতই করেননি, বরং তাকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। ১৯০৬ সালে তাঁর পিতা হাকিম হাফিজ আব্দুল মজিদ দিল্লির একটি গলিতে ‘হামদার্দ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর ও সুলভ মূল্যের ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যে তাঁরা একটি ছোট ইউনানি ওষুধের দোকান শুরু করেন।পিতার অকাল মৃত্যুর পর মাত্র ১৪ বছর বয়সে হাকিম আব্দুল হামিদ হামদার্দের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেখানে আধুনিক চিন্তাধারার প্রবেশ ঘটান।
হাকিম আব্দুল হামিদ
তিনি ঐতিহ্যবাহী ইউনানি চিকিৎসার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একটি শিল্প বিপ্লব আনেন।
নতুন যন্ত্র, গবেষণাগার এবং পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি হামদার্দকে একটি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন।
তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ফলস্বরূপ ১৯৪৮ সালে হামদার্দকে ওয়াকফ ঘোষণা করা হয়, যার ফলে সেবা ও দানশীলতাকে এর মূল নীতি হিসেবে গড়ে তোলা হয়। হাকিম আব্দুল হামিদ পদ্মশ্রী,পদ্মভূষণসহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। হাকিম আব্দুল হামিদের জীবন এক অনুপ্রেরণা, উদ্ভাবন, সেবা এবং নিষ্ঠার প্রতিমূর্তি। তাঁর উত্তরাধিকার আজও হামদার্দের প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবন্ত রয়েছে।
৪. ইউসুফ খোয়াজা হামিদ:
ড. ইউসুফ খোয়াজা হামিদ একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী-উদ্যোক্তা এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সিপলা (Cipla)-র প্রধান।
১৯৩৬ সালে লিথুয়ানিয়ায় জন্মগ্রহণকারী হামিদ ভারতে বড় হয়ে ওঠেন।তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাজ্য) থেকে রসায়ন বিজ্ঞানে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং জৈব রসায়নে পিএইচডি অর্জন করেন।
ড. ইউসুফ খোয়াজা হামিদ
বিশেষ করে এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া এবং টিবি-এর মতো রোগের জন্য সুলভ মূল্যের ওষুধ সরবরাহ করে, ড. হামিদ ভারতসহ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পেটেন্টমুক্ত জেনেরিক ওষুধের মাধ্যমে তিনি ওষুধ শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন ।
যে সময়ে অন্যান্য কোম্পানি প্রতি বছর ১০ হাজার ডলারে এই ওষুধ বিক্রি করছিল, সে সময়ে তিনি এইচআইভি রোগীদের জন্য প্রতিদিন মাত্র এক ডলারে ট্রিপল থেরাপি ওষুধ সরবরাহ করেছিলেন।এর ফলে আফ্রিকা সহ বহু উন্নয়নশীল দেশে চিকিৎসা সেবা সুলভ হয়ে উঠেছিল।ভারত সরকার ২০০৫ সালে ড. হামিদকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।এছাড়াও তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন,যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকা ও ইউরোপের স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রদত্ত একাধিক সম্মান।তিনি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা নন, বরং মানবতার একজন প্রকৃত সেবক ।
৫. তৌসিফ মির্জা:
সব বাধা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে তৌসিফ মির্জা ভারতীয় চামড়া শিল্পকে সফলতার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
মির্জা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি শুধু একটি কোম্পানিকেই নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ শিল্পকেই রূপান্তরিত করেছেন।তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি ভারতের চামড়া ও জুতা শিল্পকে বিশ্ব মানচিত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তৌসিফ মির্জার নেতৃত্বে মির্জা ইন্টারন্যাশনাল আজ ভারতের অন্যতম বৃহৎ চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত।
তৌসিফ মির্জা
স্টিভ ম্যাডেন, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, কেনেথ কোল এবং টমি হিলফিগার-এর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এই কোম্পানির বিশেষত্বের প্রমাণ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মার্ক ফিচার কোম্পানির সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তাঁর বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে
‘অফ দ্য হুক’, ‘অকট্রেক’ এবং ‘থমাস ক্রিক’-এর মতো ব্র্যান্ডের মাধ্যমে তিনি ফ্যাশন জুতার প্রিমিয়াম সেগমেন্টে ভারতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছেন।যুক্তরাজ্যের মিল্টন কেইনসে একটি ডিজাইন স্টুডিও এবং একটি তরুণ দলের সঙ্গে তিনি গুণগত মান, উদ্ভাবন এবং বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণকে নিজের মূলমন্ত্র হিসেবে বিশ্বাস করেন।তৌসিফ মির্জা আজ চামড়া শিল্পের ভবিষ্যতের অন্যতম শক্তিশালী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক স্তম্ভ ।
৬. মোহাম্মদ মাইনাল:
হিমালয়ান ড্রাগস কোম্পানি (বর্তমানে হিমালয়া ওয়েলনেস কোম্পানি)–এর অনুপ্রেরণামূলক গল্প শুরু হয় ১৯৩০ সালে মোহাম্মদ মাইনালের হাত ধরে। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী এবং প্রকৃতিপ্রেমী, যিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন। মোহাম্মদ মাইনাল দেরাদুনে কোম্পানিটির ভিত্তি স্থাপন করেন, যখন তিনি রাউওলফিয়া সারপেন্টিনা নামক ঔষধি উদ্ভিদের গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে প্রথম সফল পণ্য তৈরি করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আয়ুর্বেদকে বৈধতা প্রদান করে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা ।
মোহাম্মদ মাইনাল
এই চিন্তার ফলস্বরূপ ১৯৫৫ সালে ‘Liv.52’ বাজারে আনা হয়, যা আজও হিমালয়া ওয়েলনেস-এর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বিশ্বস্ত হেপাটো-প্রোটেক্টিভ পণ্য হিসেবে বিবেচিত।তাঁর পুত্র মিরাজ মাইনাল ১৯৭৫ সালে বেঙ্গালুরুতে একটি উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করে কোম্পানির বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণের ভিত্তি স্থাপন করেন।
আজ হিমালয়া ওয়েলনেস কোম্পানি ১০৬টি দেশে উপস্থিত থেকে ১০,০০০-এর বেশি কর্মী নিয়োগ করেছে এবং এর বার্ষিক লেনদেন ৩৭.৬ বিলিয়নেরও বেশি। ভারতীয় ঔষধ ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে মোহাম্মদ মাইনালের অবদান ঐতিহাসিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক ।
৭. ইউসুফ আলী এম.এ:
লুলু গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ আলী এম.এ আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ভারতীয় উদ্যোক্তা। তাঁর নেতৃত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা লুলু গ্রুপকে বিশ্বব্যাপী খুচরা বিক্রির শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ইউসুফ আলী এম.এ
আবুধাবিতে প্রধান কার্যালয় থাকা এই গ্রুপটি আজ উপসাগরীয় দেশগুলি সহ বিশ্বের বহু স্থানে বিভিন্ন শপিং মল ও হাইপারমার্কেট পরিচালনা করে,যা বহু গ্রাহকদের চাহিদা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করে ।
বর্তমানে লুলু গ্রুপ ৪৬টি দেশে বিস্তৃত, যেখানে ৭০,০০০-এরও বেশি কর্মী নিয়োজিত।সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বহু দেশে এই গ্রুপের উপস্থিতি রয়েছে এবং এর বার্ষিক বৈশ্বিক ব্যবসা ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।
শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই নয়, ইউসুফ আলী সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দান-অনুদানের ক্ষেত্রেও অগ্রণী।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ সহায়তা ক্ষেত্রে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।আবুধাবি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-র প্রাক্তন উপ-সভাপতি হিসেবে তিনি চারবার নির্বাচিত হয়েছেন।তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি,কঠোর পরিশ্রম এবং মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণে গঠিত এই গল্পটি এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে
৮. ড. হাবিল খোরাকিওয়ালা:
ড. হাবিল খোরাকিওয়ালা একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি পরিবর্তনকে নিজের চিন্তা ও কর্মনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে Wockhardt কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে তিনি ভারতের প্রথম গবেষণাভিত্তিক বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবা কোম্পানির ভিত্তি স্থাপন করেন।
ড. হাবিল খোরাকিওয়ালা
এই কোম্পানি আজ ঔষধ, বায়োটেকনোলজি, API এবং সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।
ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে একটি প্ল্যান্ট স্থাপন থেকে শুরু করে আমেরিকা ও ইউরোপের ওষুধ কোম্পানি অধিগ্রহণ পর্যন্ত, তিনি প্রতিটি পদক্ষেপে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
Wockhardt আজ বিশ্বের একমাত্র কোম্পানি, যাকে USFDA-র পক্ষ থেকে ছয়টি অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের জন্য QIDP মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে যা "সুপারবাগ"-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক বিপ্লবী পদক্ষেপ। তাঁর নেতৃত্বে Wockhardt ভারতের প্রথম পুনঃসংযোজিত ভ্যাকসিন ‘BioVac-B’ এবং স্বয়ংক্রিয় ইনসুলিন পেন ‘Voshulin’-এর মতো উদ্ভাবন করেছে।
Purdue University থেকে স্নাতকোত্তর এবং Harvard Business School থেকে Advanced Management Program সম্পন্নকারী তিনি ছিলেন প্রথম অ-আমেরিকান, যাকে Purdue সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে।
‘Odyssey of Courage’ এবং ‘Wockhardt School of Courage’ নামক গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি আজকের প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন।সামাজিক দায়িত্ব পালন করে তিনি Wockhardt Foundation প্রতিষ্ঠা করেন, যা মানবতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
৯. আজহার ইকবাল:
বিহারের কিশনগঞ্জ-এর মতো পিছিয়ে পড়া জেলা থেকে উঠে এসে IIT-দিল্লিতে প্রবেশ করা আজহার ইকবাল আজ ভারতের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া অ্যাপ InShorts-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। InShorts-এর বিশেষত্ব হলো ৬০ শব্দে নিরপেক্ষ,সহজবোধ্য সংবাদ পরিবেশন। এই অনন্য ধারণার ফলে InShorts আজ ১০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারী, ৫০০+ কর্মচারী এবং ৫৫ কোটি ডলারের মূল্য নিয়ে একটি সফল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।
আজহার ইকবাল
আজহার ইকবালের মতে, “পৃথিবীকে বোঝা সহজ, কিন্তু আমরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিষয়গুলো জটিল করে তুলি।” এই ভাবনা থেকেই তিনি ২০১৩ সালে একটি ফেসবুক পেজ শুরু করেন, যেখানে তিনি ৬০ শব্দে সংবাদ পোস্ট করতেন।গবেষণা বা জরিপের পরিবর্তে তিনি সরাসরি MVP (Minimum Viable Product) চালু করেন এবং ব্যবহারকারীদের মতামত থেকে শিখতে শুরু করেন ।
IIT-এর বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি News In Shorts-কে একটি অ্যাপে রূপান্তরিত করেন এবং Times Internet-এর স্টার্টআপ অ্যাক্সিলারেটর-এ যোগ দিয়ে ব্যবসার গভীরতা বুঝতে সক্ষম হন। InShorts-এর মডেলটি বিনামূল্যে সংবাদ পরিষেবার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে ব্র্যান্ডেড B2B বিজ্ঞাপন থেকে রাজস্ব আয় করা হয়।
বর্তমানে আজহার ইকবাল Shark Tank India-র বিচারক এবং InShorts হয়ে উঠেছে নতুন ভারতের দ্রুত, সহজ ও স্মার্ট চিন্তাধারার প্রতীক।
১০. ইরফান রজক:
প্রেস্টিজ গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান রজক ভারতের রিয়েল এস্টেট খাতের একজন অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব। বেঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করে এবং সেখানেই বেড়ে ওঠা ইরফান রজক ১৯৮৬ সালে তাঁর পিতা রজক সাত্তার প্রতিষ্ঠিত প্রেস্টিজ গ্রুপ-কে একটি ছোট উদ্যোগ থেকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করেন।
ইরফান রজক
গত চার দশকে, তিনি আবাসিক, বাণিজ্যিক, খুচরা এবং আতিথ্য খাতের বহু সম্মানজনক প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাঁর কৌশলগত চিন্তাধারা, বাজারের গভীর বোঝাপড়া এবং উদ্ভাবনের প্রতি গুরুত্বের ফলে কোম্পানিটি অসংখ্য পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে ।
ইরফান রাজাকের নেতৃত্ব ব্যবহারিক,সুলভ এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি কর্মচারী, গ্রাহক এবং অংশীদারদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলে একটি ইতিবাচক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ক্ষেত্রে তাঁর সমাজসেবা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
তিনি একাধিক সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেছেন, যেমন:- FRICS- EY Entrepreneur of the Year 2022 কর্ণাটক রাজোৎসব পুরস্কার 2024- ET Business Award 2025।তিনি শুধু প্রেস্টিজ গ্রুপ-এরই নয়,বরং সমগ্র রিয়েল এস্টেট শিল্পের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা একজন দূরদর্শী নেতা।