বিরোধী আসন থেকে নবান্নের শীর্ষে: বাংলার রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর ঐতিহাসিক উত্থান
দেবকিশোর চক্রবর্তী
শুভেন্দু অধিকারী, বাংলার রাজনীতিতে এক বিতর্কিত, আবার একই সঙ্গে অত্যন্ত প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, দলবদল, আন্দোলন এবং নির্বাচনী লড়াই পেরিয়ে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসলেন তিনি। বিরোধী দলনেতা থেকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা কার্যত বিরলতম নজির।
১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে জন্ম শুভেন্দুর। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা হলেও তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৮ সালে কাঁথি প্রভাত কুমার মহাবিদ্যালয়ে পড়াকালীন ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি। মাত্র এক বছরের মধ্যেই ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি।
স্থানীয় রাজনীতি থেকেই তাঁর উত্থানের শুরু। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কংগ্রেসের প্রতীকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরে কাঁথি পুরসভার পুরপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব সামলান। তবে রাজ্য রাজনীতির ময়দানে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ খুব সুখকর ছিল না। ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে সমাজবাদী দলের নেতা কিরণময় নন্দীর কাছে পরাজিত হতে হয় তাঁকে।
কিন্তু সেই পরাজয়ই যেন তাঁর রাজনৈতিক জেদের ভিত আরও শক্ত করে। ২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে জিতে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক হন শুভেন্দু অধিকারী। এরপরই রাজ্য রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান শুরু তাঁর। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি গোটা বাংলায় পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। সেই আন্দোলন শুধু রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণই বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও।
প্রতীকী ছবি
২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০১১ সালে জঙ্গলমহলে তৃণমূলের সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। রাজনৈতিক কৌশল, সংগঠন পরিচালনা এবং জনসংযোগ, এই তিনের সমন্বয়ে তিনি ধীরে ধীরে দলের অন্যতম শক্তিশালী মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে জিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী হন শুভেন্দু। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে ভারতীয় জনতা দলে যোগ দেন তিনি।
এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে ওঠে। নন্দীগ্রামে সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে রাজ্যের প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে উঠে আসেন শুভেন্দু। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর আক্রমণাত্মক ভূমিকা তাঁকে আরও বেশি আলোচনায় নিয়ে আসে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি একসঙ্গে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হন। বিশেষ করে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হারানো জাতীয় রাজনীতিতেও বড় চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। সেই জয়ের ধারাবাহিকতায় ৮ মে ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ভারতীয় জনতা দল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী।
২৫ বৈশাখ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। রাজ্যপালের হাত থেকে শপথ নিয়ে বাংলার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেন শুভেন্দু অধিকারী।
ছাত্রনেতা থেকে আন্দোলনের মুখ, মন্ত্রী থেকে বিরোধী দলনেতা, আর সেখান থেকে মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারীর এই রাজনৈতিক যাত্রা নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচনা করল।