ঘোড়ার ছন্দে মানসিক আরোগ্য: হায়দ্রাবাদের নিমরাহ মির্জার ‘ট্রট অ্যান্ড টক’–এর অনন্য উদ্যোগ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 d ago
হায়দ্রাবাদের নিমরাহ মির্জার ‘ট্রট অ্যান্ড টক’–এর অনন্য উদ্যোগ
হায়দ্রাবাদের নিমরাহ মির্জার ‘ট্রট অ্যান্ড টক’–এর অনন্য উদ্যোগ
 
রত্না জি চোত্রাণী / হায়দ্রাবা

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে বিকল্প থেরাপির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে, আর সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ঘোড়ার সাহায্যে থেরাপির অনন্য পদ্ধতি। হায়দ্রাবাদের তরুণ অশ্বারোহী নিমরাহ মির্জা প্রতিষ্ঠিত ‘ট্রট অ্যান্ড টক’ এই ধারণাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত রেসহর্সদের ব্যবহার করে শিশু, তরুণ এবং মানসিক চ্যালেঞ্জে ভুগছেন এমন মানুষের জন্য তৈরি করেছে এক অপরিচিত অথচ গভীরভাবে কার্যকর থেরাপির জগৎ। এই উদ্যোগ হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত রেসহর্সকে আশ্রয় দেয়, পাশাপাশি এমন বহু মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে যাদের পক্ষে ব্যয়বহুল বা পেশাদার থেরাপি নেওয়া সম্ভব নয়।
 
ইকুইন অ্যাসিস্টেড থেরাপি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। সহজ ভাষায়, এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক থেরাপি, যেখানে একটি ঘোড়া এবং একজন প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী একসঙ্গে কাজ করেন, যাতে ক্লায়েন্টের মানসিক উপকার হয়।
 
নিমরাহ মির্জা তাঁর একটি ঘোড়ার সাথে 
 
নিমরাহ মির্জা উদ্যোক্তা, পলো প্লেয়ার ও ঘোড়ার মালিক আদিল মির্জার কন্যা। তিনি বলেন, “আমি মূলত ঘোড়ার পিঠের শব্দেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে ঘোড়া ছিল, বাবা নিয়মিত ঘোড়া চালাতেন এবং পোষতেন। তাই ঘোড়ার ট্রট, গতি, সবকিছুই আমার কাছে স্বাভাবিক।”
 
বছর কেটে গেলেও নিমরাহর হৃদস্পন্দন এখনও ঘোড়ার ছন্দে বাঁধা। আজ তিনি শুধু শিশু ও বয়স্কদের মানসিক থেরাপিই দেন না, বরং তরুণী ও শিশুদের ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসা জাগাতেও অনুপ্রাণিত করেন। তিনি বলেন, “আমি সারাজীবনই ঘোড়ার সঙ্গে থেকেছি। ওরা আমার জীবনের অংশ, তাই ঘোড়ার প্রতি ভালবাসা ও টান খুব গভীর।”
 
মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স, কাউন্সেলিং ডিগ্রি, আন্তর্জাতিক EFT (ইমোশনাল ফ্রিডম টেকনিক) সার্টিফিকেশন এবং ইকুইন অ্যাসিস্টেড লার্নিং (EAL)-এর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিমরাহ বলেন, তিনি নিজে একসময় হালকা উদ্বেগে ভুগেছিলেন; আর ঘোড়াই তাঁকে শান্তি ও স্থিরতা দিয়েছে।
 
নিমরাহর মতে, ঘোড়া ও মানুষের সম্পর্ক বিশেষ। “এটা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক জটিল বন্ধন,” তিনি বলেন। “দুজনের মধ্যে দুর্বল আসলে মানুষই। যখন আপনি ঘোড়ায় চড়েন, তখন ঠিক ততটাই আপনাকে ওদের সম্মান ও বিশ্বাস করতে হয়, যতটা তারা আপনাকে করে।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “ঘোড়ার সঙ্গে থাকা মানে সম্পূর্ণভাবে মুহূর্তে থাকা। এতে মনের উদ্বেগ, ভয়, ট্রমা, সবকিছু থেকে সাময়িক দূরত্ব তৈরি হয়, আর সেই বিচ্ছেদই শান্তি আনে।”
 
নিমরাহ মির্জা তাঁর বাবার সাথে
 
মাস্টার্সের পর হাসপাতালে ও কাউন্সেলিং সেন্টারে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তবে ঘোড়ার সঙ্গে কাজ করেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন আরও স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক আরোগ্যের পথ। এ ভাবনাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে ‘ট্রট অ্যান্ড টক’ শুরু করতে, যেখানে মানুষের মন, দেহ ও আবেগের সুস্থতায় ঘোড়া হয়ে ওঠে এক বন্ধু, শিক্ষক ও সহচর।
 
নিমরাহ বিভিন্ন কর্মশালা পরিচালনা করেন, যেখানে মানুষ শিখতে পারেন ঘোড়া কীভাবে মানসিক উন্নতিতে সাহায্য করে। কর্মশালাগুলো আকর্ষণীয়, ইন্টার‌্যাকটিভ এবং আনন্দময়। তিনি কাজ করেন- স্ট্রেস, উদ্বেগ বা জীবন–পরিবর্তনের মধ্যে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে, নিরাপদ জায়গার প্রয়োজন আছে এমন শিশুদের সঙ্গে, শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জড ব্যক্তিদের সঙ্গে, বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে।  
 
ঘোড়াকে আদর করা, খাওয়ানো, হাঁটানো বা চড়ার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা আত্ম-সচেতনতার অনুভূতি পান। হায়দরাবাদে প্রথমবারের মতো এই ইকুইন অ্যাসিস্টেড লার্নিং থেরাপি চালু করেন নিমরাহ, এবং এখন তিনি নিয়মিত কর্মশালা পরিচালনা করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ঘোড়াদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা খুব তীক্ষ্ণ। মানুষের শরীরী ভাষা, কণ্ঠস্বর, আবেগ, সবই তারা অনুভব করে। এই সংবেদনশীলতাই থেরাপিতে তাদের আদর্শ সঙ্গী করে তোলে।”
 
আজ তাঁর কাছে আসেন, মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন প্রাপ্তবয়স্ক, গুরুতর নিউরোডাইভারজেন্ট শিশু, দুই বছর বয়স থেকে ৭০ বছর বয়সী ক্লায়েন্ট। তিনি বলেন, “যেসব নন-ভার্বাল শিশু প্রথমে ঘোড়াকে দেখে ভয় পায় বা চোখে চোখ রাখে না, তারা শেষ পর্যন্ত ঘোড়াকে জড়িয়ে ধরে, ঘন্টার পর ঘন্টা ব্রাশ করে আর আমাকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, ‘গুড?’”
 
নিমরাহ মির্জা
 
“অনেক সময় শিশুরা স্টেমিং বন্ধ করে শান্ত হয়ে যায়, যার কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। অভিভাবকরা বিস্মিত হন।” নিমরাহ বলেন, তিনি দেখেছেন শিশুরা আরও আত্মবিশ্বাসী ও প্রকাশভঙ্গিমায় সমৃদ্ধ হয়েছে।তিনি জানান, “ইকুইন থেরাপি শুধু ঘোড়ার আশেপাশে থাকা নয়। দু’ধরনের থেরাপি আছে, হিপো থেরাপি (রাইডিং) এবং হর্স–অ্যাসিস্টেড থেরাপি।”
 
“ঘোড়ার প্রতিটি ক্রিয়ার একটি ছন্দ আছে, দৌড়ানো, ট্রট করা বা লেজ নাড়ানো, যা খুবই নির্দিষ্ট। এই ছন্দ মনকে প্রশান্ত করে। ক্লায়েন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী ঘোড়া বেছে নেওয়া হয়।” থেরাপি কতটা কার্যকর, এ প্রশ্নে নিমরাহ বলেন, “ভাবুন, আপনার শিশুকে কি চারদেওয়ালের ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া ভালো, নাকি খোলা আকাশ, প্রশস্ত ইকুয়েস্ট্রিয়ান সেন্টার আর ঘোড়ার সঙ্গ? আমাদের বিশ্বাস, এই থেরাপি প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে দশগুণ বেশি ফলদায়ক।”