চিকমাগলুরের সবুজ পাহাড় থেকে সমাজ বদলের কণ্ঠস্বর ড. ফারিদা রহমানতুল্লা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
ড. ফারিদা রহমানতুল্লা
ড. ফারিদা রহমানতুল্লা
 
সানিয়া আঞ্জুম/ বেঙ্গালুরু 

একজন নারী, যার দৃঢ় সংকল্প বদলে দিয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন। চিকমাগালুরের সবুজ পাহাড়ের মাঝে জন্ম নেওয়া এক সাধারণ মেয়ে থেকে বেঙ্গালুরুর মতো মহানগরে সমাজ সংস্কারের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা, ড. ফারিদা রহমানতুল্লার যাত্রা সত্যিই অনন্য। দারিদ্র্য ও অশিক্ষার অন্ধকারে আবদ্ধ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন আশার আলো। শিক্ষা, সাহিত্য এবং নিঃস্বার্থ সমাজসেবার মাধ্যমে কীভাবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ ড. ফারিদা।

“আমার জন্মভূমি আমার কাছে স্বর্গের মতো,” বলেন ড. ফারিদা রহমানতুল্লা, তাঁর কণ্ঠে গর্ব ও আত্মমগ্নতার সুর। কফি, মরিচ, ঢেউ খেলানো পাহাড় আর অনন্ত সবুজে ঘেরা কর্ণাটকের চিকমাগলুর জেলার গুল্লানপেটেই তাঁর জন্ম। এই স্থানই তাঁর শৈশবের মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের বোধকে গড়ে তোলে। এটি এমন এক জায়গা ছিল, যেখানে কন্যাদের ভালোবাসা, যত্ন এবং সম্মানের সঙ্গে বড় করা হতো। তবুও, এই উষ্ণতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নীরব বৈপরীত্য।
 
ড. ফারিদা রহমানতুল্লা মাদ্রাসার অভাবী শিক্ষার্থীদেরকে চেক বিতরণের মুহূর্তে
 
একসময়, মেয়েদের শিক্ষা প্রায়ই কৈশোরের পরেই থেমে যেত, এবং নির্দিষ্ট সীমার পরে তাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হতো, কেবল বিরল কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যেত। যত্ন আর সীমাবদ্ধতার এই প্রাথমিক বৈপরীত্যই তাঁর মনে প্রশ্নের প্রথম বীজ বপন করে।
 
বিবাহ তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়, তাঁকে গ্রামীণ পরিবেশ থেকে শহুরে বেঙ্গালুরুর বিস্তৃত জীবনে নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তিনি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল গভীর বৈষম্যও। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী বহু মুসলিম পরিবারের অবস্থা ছিল হৃদয়বিদারক। মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ পেত না, ছেলেরা সাইকেল মেরামতের দোকানে দীর্ঘ সময় কাজ করত, নারীরা অন্ধকার ঘরে বসে আগরবাতি তৈরি করত, আর বহু পুরুষ বেকারত্ব বা মদ্যপানের ফাঁদে আটকে থাকত।
 
“সেদিনই আমি কাজ করার এবং এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,” তিনি স্মরণ করেন। এটি রাগের মুহূর্ত ছিল না, বরং দৃঢ় সংকল্পের, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ থেকে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত। শিক্ষাই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। “শিক্ষা আমার নেশা এবং আমার অগ্রাধিকার,” দৃঢ়ভাবে বলেন ড. ফারিদা। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক দিশা ও মূল্যবোধ দিয়ে একটি শিশুকে শিক্ষিত করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। শিশুরা নিজেদের, তাদের পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত সমাজের প্রতি যত্নবান হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে সমাজসেবা ও শিক্ষা একে অপরের থেকে অবিচ্ছেদ্য। “মানবতার সেবা, মানুষের সেবা, এটাই সবচেয়ে বড় সেবা,” তিনি বলেন, যা তাঁর প্রতিটি উদ্যোগের পথপ্রদর্শক।
 
ড. ফারিদা রহমানতুল্লা
 
বেঙ্গালুরুতে আসার পর তিনি এনএমকেআরভি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, এরপর বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ধারওয়াড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উর্দুতে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয় ও কণ্ঠস্বর। তিনি দুটি উপন্যাস এবং তিনটি ছোটগল্প সংকলন রচনা করেন, যেখানে সামাজিক বাস্তবতাকে সংবেদনশীলতা ও সাহসের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ত্রিশ বছর ধরে তিনি ‘জাররিন শুওয়ায়েন’ নামের একটি উর্দু মাসিক পত্রিকার স্রষ্টা ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন, যা অসংখ্য পাঠকের জন্য একটি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
 
তবে তাঁর স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখা যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ‘হোলি মাদারস ইংলিশ স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে ড. ফারিদা নিশ্চিত করেন যে শিক্ষা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহানুভূতিশীল। সেখানে প্রায় চল্লিশ শতাংশ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে শিক্ষা পায়, এবং এই বিদ্যালয় সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত। পরে তিনি এই মিশনে পিছিয়ে পড়া মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করতে আভালাহল্লি বস্তি এলাকায় আরেকটি হোলি মাদারস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ানো হয়।
 
কোভিড মহামারী তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। লকডাউনের সময় ও পরে তিনি বুঝতে পারেন, বস্তির শিশুদের অনলাইন ক্লাসে কোনো প্রবেশাধিকার নেই। যেখানে অনলাইন শিক্ষা ছিলও, তার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট ছিল। অনেক শিশু মনোযোগ হারায়, স্ক্রিনের প্রতি আসক্তি বাড়ে, এবং পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
 
একটি মেডিকেল ক্যাম্পে ড. ফারিদা
 
এতে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি জেপি নগর ৫ম ফেজে অবস্থিত হোলি মাদারস স্কুলে তাঁর প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেন, যা এখন পঁয়ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সফলভাবে চলছে। “আমি ড্রপআউট শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে তাদের ভারতের সেরা নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি,” তিনি বলেন। ফলাফলও স্পষ্ট, আজ তাঁর শিক্ষার্থীরা স্থিতিশীল ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করছে।
 
শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, ড. ফারিদার কাজ সমাজকল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। তিনি ‘আল হুদা উইমেনস ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা নারীর ক্ষমতায়ন, বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং চিকিৎসা ও সামাজিক সংকটে থাকা পরিবারগুলিকে সহায়তা করে। তিনি মায়েদের মধ্যে মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস, সচেতন মা একটি পুরো প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারে। তাঁর বার্তা স্পষ্ট, “আপনার অর্থ ও প্রতিভা ব্যবহার করুন প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য।”
 
তাঁর অবদান অদেখা থাকেনি। ২০০৮ সালে তিনি সাহিত্যকর্মের জন্য কর্ণাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের একটি সম্মান। তিনি দু’বার কেএউএ পুরস্কার পেয়েছেন, সফল উদ্যোক্তা পুরস্কার অর্জন করেছেন এবং আট বছর ইউনিসেফ-এর সহযোগী সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কর্ণাটক হজ কমিটির সদস্য হিসেবেও মনোনীত হয়েছিলেন। বেঙ্গালুরু জুড়ে তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ যে বহিরঙ্গন হোর্ডিংগুলি দেখা যায়, তা এক নিঃশব্দ সেবিকার বিরল স্বীকৃতি। “মানুষ যখন আমার কাজকে স্বীকৃতি দেয়, তখন মনে হয় আল্লাহ আমার কাজে সন্তুষ্ট,” তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন।
 
২০১৯ সালে সেন্ট মাদার টেরেসা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে, এবং তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে কুভেম্পু বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল গবেষণাও সম্পন্ন হয়। প্রায় একশোটি পুরস্কার থাকা সত্ত্বেও তিনি স্থির ও বিনয়ী, সাফল্যকে মাপেন পরিবর্তিত জীবনের মাধ্যমে, ট্রফির মাধ্যমে নয়। শেষে, যখন তাঁকে তাঁর বার্তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে কথা বলেন। “নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের ভাষাকে ভালোবাসুন, নিজের মানুষদের ভালোবাসুন। অন্য ভাষা ও ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের সম্মান করুন।” তাঁর জীবন সহাবস্থান, সহানুভূতি ও সাহসের এক জীবন্ত উদাহরণ।
 

চিকমাগলুরের সবুজ পাহাড় থেকে বেঙ্গালুরুর ব্যস্ত জনজীবন পর্যন্ত ড. ফারিদা রহমানতুল্লার যাত্রা দেখায়, দৃঢ় লক্ষ্য থাকলে কী অর্জন করা যায়। তিনি পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করেননি, বরং নিজেই পরিবর্তন হয়ে উঠেছেন। হোলি মাদারস স্কুল পরিদর্শনের সময় পুলিশ ইন্সপেক্টর মালুররাজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন।