পাহেলগাম হামলার বর্ষপূর্তি: আদিল ও ২৫ পর্যটকের স্মারক পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতার নীরব সাক্ষ্য
দানিশ আলি / পাহেলগাম
পাহেলগামের রক্তাক্ত জঙ্গি হামলার এক বছর পরও বৈসারান উপত্যকার বাতাসে যেন সেই দিনের আর্তনাদ ভেসে বেড়ায়। যেখানে একসময় পর্যটকদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকত পাহাড়ি প্রান্তর, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি স্মারক, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ২৫ জন পর্যটক এবং এক স্থানীয় সেবাদাতার নাম খোদাই করা সেই স্মৃতিস্তম্ভ পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতা, কাশ্মীরবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী মানসিকতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
একসময় এই জায়গায় দিনভর পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত। মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে সবাই আনন্দে মেতে থাকতেন। আজ সেখানে নেমে এসেছে গভীর বিষাদের ছায়া। ঘোড়া ও পোনির কাজ করা স্থানীয় বাসিন্দা নাজির আহমেদ বলেন, নিহতদের যন্ত্রণা এবং সেই দিনের ভয়াবহতা তিনি এখনও অনুভব করেন।
তিনি জানান, এই রমজানে পর্যটননির্ভর স্থানীয় মানুষজন, যাঁদের জীবিকা পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল ছিল, সকলে মৃতদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেছেন। বিশেষ করে সেই মহিলার জন্যও প্রার্থনা করেছেন, যাঁর মৃত স্বামীর দেহের পাশে বসে থাকা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি তাঁকে কখনও ভুলতে পারব না। তিনি আমাদের বোন।”
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ দিন পাহেলগাম এখনও ভুলতে পারেনি। বৈসারান উপত্যকায় গুলির শব্দ শুধু ২৬টি নিরপরাধ প্রাণই কেড়ে নেয়নি, গোটা অঞ্চলকে শোক ও আতঙ্কে ডুবিয়ে দিয়েছিল।
তিন জঙ্গি ধর্ম জিজ্ঞাসা করে পুরুষদের হত্যা করেছিল, যাঁদের অধিকাংশই হিন্দু এবং একজন মুসলিম, যিনি প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। এরপর চারদিকে চিৎকার, হাহাকার আর শিশু ও নারীদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বাঁচার জন্য ছুটছিলেন প্রত্যেকে। সেই সময় এক তরুণ, সৈয়দ আদিল হুসেন, হত্যালীলা থামানোর চেষ্টা করেন এবং মানবতা ও দেশবাসীর সুরক্ষায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন।
গুলনাজ আখতার
হাপতনার ও আশপাশের গ্রামের মানুষের কাছে আদিল আজ এক বীর। তাঁদের বিশ্বাস, তাঁর সাহসী হস্তক্ষেপ না থাকলে জঙ্গিরা আরও বহু মানুষকে হত্যা করতে পারত। আদিল ছিলেন এক পোনি গাইড। হামলার সময় তিনি অসাধারণ সাহস দেখিয়ে এক জঙ্গির হাত থেকে পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পর্যটকদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি প্রাণ দেন। আজ তাঁর নামও পাহেলগামের স্মারকে খোদাই করা রয়েছে।
তিনি জঙ্গিদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “এরা আমাদের অতিথি। কেন গুলি চালাচ্ছ? এদের দোষ কী?” এরপর জঙ্গিরা তাঁকেও অতিথিদের সঙ্গে হত্যা করে। আজ বৈসারানের রাস্তা ফাঁকা পড়ে আছে, চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া। স্থানীয় আব্দুল গনি ও নাজির আহমেদ জানান, হামলার পর পর্যটকেরা আর আসেননি। ফলে ঘোড়াওয়ালা, চালক এবং বহু মানুষের কাজ চলে গেছে। জীবন এখন কঠিন হয়ে উঠেছে।
আদিল এখন স্থানীয়দের গর্বের প্রতীক। তাঁরা বলেন, পর্যটকেরাই ছিলেন তাঁদের জীবিকা, তাঁদের সঙ্গে ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক। হাপতনারে ‘আওয়াজ’ দলের সঙ্গে দেখা হয় শহিদ আদিল হুসেনের স্ত্রী গুলনাজ আখতারের সঙ্গে, যিনি বর্তমানে তাঁর মায়ের বাড়িতে থাকেন। তিনি বলেন, গত এক বছর তাঁর কাছে অত্যন্ত কঠিন ছিল। স্বামী ছাড়া জীবন অর্থহীন মনে হয়।
সৈয়দ আদিল হুসেন
তিনি বলেন, “জীবন তো কোনোভাবে চলে যায়, কিন্তু তাতে আর আনন্দ বা অর্থ থাকে না। আদিল সাহেব সত্যিই সাহসী ছিলেন। যেখানে সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়চ্ছিল, সেখানে গুলির বৃষ্টির মধ্যেও তিনি মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। পর্যটকদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনি প্রাণ দিয়েছেন। আমি তাঁকে নিয়ে গর্বিত। খুব কম মানুষই এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।”
গুলনাজের মা জানান, সেদিন আদিল কাজে গিয়েছিলেন। পরে হামলার খবর আসে। সন্ধ্যার পর তাঁরা জানতে পারেন, আদিল শহিদ হয়েছেন। তিনি বলেন, “সেই থেকে আমরা সকলে শোকে ডুবে আছি। গুলনাজ এখনও সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।”
শহিদের বাবা সৈয়দ হায়দার হুসেন শাহ বলেন, তিনি তাঁর ছেলেকে নিয়ে গর্বিত। তাঁর কথায়, আদিল নিজের প্রাণ দিয়ে শুধু মানুষকেই বাঁচাননি, গোটা কাশ্মীরের নাম উজ্জ্বল করেছেন। তিনি শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত স্মরণ করেন। সেই দিন সকালে ছোট ছেলে নওশাদ, যিনি পর্যটকদের জন্য ট্যাক্সি চালাতেন, আগে বেরিয়ে যান। আদিল সকাল প্রায় ৮টার দিকে পরে রওনা দেন।
‘আওয়াজ’ দলের সদস্যরা যখন পরিবারটির সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন শ্রমিকরা নতুন বাড়িতে রং করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে এই বাড়িটি পরিবারটিকে উপহার দিয়েছেন।
শাহ জানান, একনাথ শিন্ডের টিমই বাড়িটি নির্মাণ করেছে। স্থানীয় এক শিবসেনা কর্মী বলেন, পাহেলগাম হামলার পর মহারাষ্ট্রের আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার করতে শিন্ডে সেখানে গেলে তাঁকে আদিলের পরিবারের কথা জানানো হয়।
শিন্ডে প্রথমে শহিদের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা সাহায্যের ঘোষণা করেন। পরে পরিবারের অবস্থা দেখে স্থানীয়দের নিয়ে একটি দল গঠন করে ভালো একটি বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি রেশন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেন।
শহীদ আদিল হুসেনের নতুন নির্মিত বাড়িতে শ্রমিকদের শেষ পর্যায়ের কাজের দৃশ্য
শাহ বলেন, তিনি মহারাষ্ট্রের ওই নেতার সহমর্মিতার জন্য কৃতজ্ঞ। তাঁর কথায়, শিন্ডে কোনও রাজনৈতিক লাভের কথা ভাবেননি, বরং তাঁদের নিজের পরিবারের মতোই দেখেছেন।
পাহেলগামের এই কাহিনি শুধুই এক ট্র্যাজেডি নয়, এটি সাহস, আত্মত্যাগ এবং মানবতার এক চিরন্তন ইতিহাস। এখানকার মানুষ এখনও ক্ষত নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে বিশ্বাস রয়েছে, একদিন ভালোবাসা, মানবতা এবং শান্তির আলো সমস্ত অন্ধকারকে জয় করবে।