প্রতিকূলতা জয় করে সাংবাদিকতার শিখরে: রানা সিদ্দিকী জামান

Story by  Aasha Khosa | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
রানা সিদ্দিকী জামান
রানা সিদ্দিকী জামান
 
আশা খোসা / নয়া দিল্লি 

ভারতীয় সাংবাদিকতার জগতে এমন কিছু নাম আছে, যারা শুধু রিপোর্টিং করেন না, তাঁরা সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীর স্পন্দনকে তুলে ধরেন তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে। সেই তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রানা সিদ্দিকী জামান, যিনি নিজের মেধা, সাহস এবং স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।
 
ভারতীয় সাংবাদিকতার পরিসরে রানা সিদ্দিকী জামান একটি সম্মানিত নাম, বিশেষ করে সিনেমা ও পারফর্মিং আর্টস নিয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার জন্য। ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় তাঁর কলামগুলো নির্ভরযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। কিংবদন্তি শিল্পী এ. আর. রহমানের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সাক্ষাৎকার আজও পাঠকদের মনে গেঁথে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ১৯৭০-এর দশকে এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন নারী কীভাবে এমন এক পেশা বেছে নিলেন, যা তখন মহিলাদের জন্য খুব একটা প্রচলিত ছিল না?
 
রানা সিদ্দিকী জামান
 
বর্তমানে স্বামীর সঙ্গে আসানসোলে বসবাস করছেন রানা, সম্প্রতি দিল্লি ছেড়েছেন। নিজের জীবনের যাত্রাপথের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, এই পথ ছিল ধৈর্য, কৌতূহল এবং নীরব প্রতিবাদের এক মিশ্রণ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। তিনি বলেন, “স্কুলে আমি কবিতা লিখতাম এবং সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে গভীর আগ্রহ ছিল। সেখান থেকেই আমার ভিতরে সাংবাদিকতার বীজ জন্মায়।”
 
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবনেও সামাজিক চাপের প্রভাব ছিল। সমাজের প্রবীণদের পরামর্শে তাঁর বাবা সন্তানদের খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল থেকে সরিয়ে নেন। পরে পরিবার আলিগড়ে চলে গেলে রানা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং নবম শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেন। মাস্টার্স পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।
 
শৈশবে পরিবারে নিজেকে অনেক সময় অবহেলিত মনে হতো তাঁর। তিনি বলেন, “আমার বড় বোন ছিল প্রথম সন্তান, তাই পরিবারের আদরের কেন্দ্র। আর ছোট ভাই জন্মেছিল বাবা-মায়ের প্রার্থনার পর, তাই তাকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। আমি যেন মাঝখানে হারিয়ে যেতাম, সবসময় চেষ্টা করতাম বাবা-মায়ের স্বীকৃতি পাওয়ার।”
 
একটি অনুষ্ঠানে রানা সিদ্দিকী জামান
 
এই স্বীকৃতির তাগিদেই তিনি স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নিয়েছিলেন, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, যা ছিল তাঁর বাবা-মায়ের ইচ্ছা। কিন্তু পদার্থবিদ্যা তাঁর কাছে কঠিন হয়ে ওঠে, আর লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা অটুট থাকে। এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি স্নাতকের জন্য আর্টস বেছে নেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বলেন, “বিজ্ঞান ছেড়ে দেওয়াটা ছিল আমার নিজের মতো করে বড় হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ।”
 
লেখার প্রতি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে সাংবাদিকতার দিকে টেনে আনে, যদিও তখন এটি মহিলাদের জন্য খুব একটা গ্রহণযোগ্য পেশা ছিল না। ১৯৯৫ সালে তিনি দিল্লিতে চলে আসেন এবং একটি ইংরেজি সংবাদপত্রে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি রিপোর্টিংয়ের দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি বলেন, “আমার সম্পাদকরা আমার কাজের প্রশংসা করতেন, এবং আমি অনেক কিছু শিখেছি।”
 
তবে তাঁর প্রাথমিক কর্মজীবন একেবারে সহজ ছিল না। এক কর্মস্থলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অফিসের অংশ হয়ে উঠেছিল। তিনি স্মরণ করেন, “দুপুরে অফিসে সমবেত নামাজ হত। একমাত্র নারী হিসেবে আমাকে আড়ালে থাকতে বলা হত, এবং নিয়মিত নামাজ পড়ার জন্যও চাপ দেওয়া হত।” এই পরিস্থিতি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। “কর্মক্ষেত্রে ধর্ম প্রদর্শনে আমি বিশ্বাস করতাম না। এই নিয়ে আমি আমার সম্পাদকের সঙ্গে তর্কও করেছি।”
 
শ্যাম বেনাগলের সঙ্গে রানা সিদ্দিকী জামান
 
সম্পাদক যদিও ধর্মীয় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক গড়ে তোলার কথা বলতেন, রানা তর্কে না জড়িয়ে নিজের কাজেই মনোনিবেশ করেন। তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেন, যার মধ্যে জৈন টিভির ওয়েব পোর্টালও ছিল। সেখানে তিনি প্রতিবন্ধকতা, বিমানযাত্রার চাপ, এবং দৃষ্টিহীনদের জীবন নিয়ে প্রতিবেদন করেন। তবে তিনি অনুভব করেন, অনেক কাজই বিজ্ঞাপনধর্মী হয়ে পড়ছিল, যা তাঁকে পেশাগতভাবে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
 
এক বড় মোড় আসে যখন তিনি ‘দ্য ট্রিবিউন’-এ সম্পাদক টি. রামচন্দ্রনের অধীনে কাজ শুরু করেন, এবং পরে ‘দ্য হিন্দু’-তে যোগ দেন। সেখানেই তিনি নিজের প্রকৃত ক্ষেত্র খুঁজে পান, থিয়েটার, সংগীত, ভিজ্যুয়াল ও পারফর্মিং আর্টস, সিনেমা এবং সংস্কৃতি নিয়ে লেখা, যা তাঁর কর্মজীবনের পরিচয় হয়ে ওঠে।
 
দিল্লিতে একা থাকা সময়টা সহজ ছিল না। তিনি বলেন, “একজন মুসলিম নারী হিসেবে একা থাকা খুব কঠিন ছিল। এমনও হয়েছে, অপরিচিত লোকেরা শুধু আমি একা থাকি বলে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করেছে।” বাবাকে উদ্বিগ্ন না করতে তিনি এসব কথা জানাতেন না। পরে তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে উঠে যান।
 
সিবিটি ওয়ার্কশপ
 
‘দ্য হিন্দু’-তে কাজের সময় তিনি নিজের ক্ষেত্রের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ হয়ে ওঠেন। এনডিটিভি, দূরদর্শন, সাহারা, আজতক, টাইমস নাউ, রাজ্যসভা টিভি, বিভিন্ন চ্যানেলে তাঁকে চলচ্চিত্র, শিল্প ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতো।
 
শৈশবে নিজেকে অবহেলিত মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে তা বদলে যায়। তিনি বলেন, “টেলিভিশনে নিয়মিত আসা এবং লেখার মাধ্যমে খ্যাতি পাওয়ার পর, আমার বাবার চোখে জল এসে যেত। তিনি বলতেন, ‘আমার মেয়ে আমাকে পরিচিতি দিয়েছে। এখন মানুষ আমাকে তার বাবা হিসেবে চেনে।’”
 
পেশাগত জীবনে ধর্ম কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, “সহকর্মীরা মজা করে বলতেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম তুমি বোরখা বা হিজাব পরবে।’ আমি হাসতে হাসতে বলতাম, ‘আমি দ্য হিন্দু-র মুসলমান।’”
 
পাকিস্তানি অভিনেত্রীর সঙ্গে রানা সিদ্দিকী জামান
 
তবে সমাজে সূক্ষ্ম বৈষম্যের অভিজ্ঞতাও তাঁর হয়েছে। গাজিয়াবাদে বড় হওয়ার সময় তাঁদের পরিবার মুসলিম পরিচয়ের কারণে ভাড়া বাড়ি পেতে সমস্যায় পড়েছিল। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার জন্য আমাদের ধর্মও লুকাতে হয়েছে।” তাঁর মতে, এই পক্ষপাত ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক নয়।
 
বিয়ে না করার জন্য সমাজের চাপও তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। “মানুষ সবসময় বিয়ে নিয়ে উপদেশ দিত, যেন বিয়ে না করলে জীবন নষ্ট হয়ে যাবে,” তিনি বলেন। কিন্তু তিনি নিজের স্বাধীনতা ও দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেন, মায়ের মৃত্যুর পর বাবাকে ও ভাইকে দিল্লিতে নিয়ে আসেন এবং ২৫ বছরের পরিশ্রমে নয়ডায় একটি বাড়ি কেনেন। “বাবার যত্ন নেওয়াই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিয়ে তখন মাথায় ছিল না।”
 
পরবর্তীতে তিনি ইউসুফ উজ জামানের সঙ্গে জীবনের সঙ্গী খুঁজে পান, যিনি পিআর ও ইভেন্টস কনসালট্যান্ট। তবে ২০১৬ সালে ‘দ্য হিন্দু’-তে ছাঁটাইয়ের ফলে চাকরি হারানো এবং পরে কোভিড-১৯ মহামারির আর্থিক প্রভাব তাঁদের জীবনে কঠিন সময় নিয়ে আসে। তিনি বলেন, “এটা বুঝিয়েছিল যে সাংবাদিকতায় সামাজিক নিরাপত্তা খুব কম।”
 

পরবর্তীতে তাঁরা আসানসোলে চলে যান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা করার জন্য। বর্তমানে রানা চিলড্রেনস বুক ট্রাস্টে পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ও ব্র্যান্ডিংয়ের লিড স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে কনটেন্ট তৈরি, কর্মশালা পরিচালনা এবং শিশুদের জন্য গল্প বলার সেশন। তিনি বলেন, “আমাদের নিজের সন্তান নেই, তাই শিশুদের সঙ্গে কাজ করা আমার কাছে ভীষণ তৃপ্তিদায়ক।” সংস্থাটি এখন পুনরায় ব্র্যান্ডিং করছে, যেখানে তাঁর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
 
তিনি বলেন, “সিবিটি-তে আমি নতুন নতুন কাজ করছি, এমন কিছু যা এই সংস্থার ৭০ বছরের ইতিহাসে আগে হয়নি।” পেছনে ফিরে তাকিয়ে রানা মনে করেন, রাজনীতি, সিবিআই, দিল্লি পুলিশ, বিমান চলাচল, স্বাস্থ্য এবং প্রতিবন্ধকতা, এত বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করার পরও তাঁকে প্রায়ই ‘সফট বিট’-এ সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবুও তিনি নিজের তৈরি করা ক্ষেত্রকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন।
 
ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে তিনি মনে করেন, সিবিটি-তে নতুন করে কর্মজীবন শুরু করা তাঁর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ, পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স কাজ করার সুযোগও তিনি পাচ্ছেন।