কেরালার ইসলামিক কমপ্লেক্স মানবতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 5 h ago
কেরালার ইসলামিক কমপ্লেক্স মানবতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কেরালার ইসলামিক কমপ্লেক্স মানবতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
 
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি

আধুনিকতার দৌড় যখন মানুষের মধ্যে দূরত্ব ও বিভেদ সৃষ্টি করছে, তখন দক্ষিণ ভারতের কেরালায় মানবতা ও সম্প্রীতির এক হৃদয়স্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে। এই চলচ্চিত্রটি একদিকে মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে এবং অন্যদিকে তাদের মুখে শান্তির হাসি ফুটিয়েছে।  

কেরালার পালক্কাড় জেলার সবুজ ও শান্তিপূর্ণ ভানিয়ামকুলাম এলাকায় অবস্থিত মনু মুসলিয়ার ইসলামিক কমপ্লেক্স (এমএমআইসি–জামিয়া রাহমিয়া) এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় স্থান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং মানব ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এখানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর যেন মানবতার সামনে আপনাআপনি ভেঙে পড়ে।

মানবতার প্রকৃত সৌন্দর্য এবং ভারতের চিরপরিচিত গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতিকে উন্মোচনকারী একটি ঘটনা সম্প্রতি ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কেরালার এক তরুণী মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে সেখানকার দৃশ্য দেখে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর চোখ বিস্ময়ে ভরে গিয়েছিল, এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি, আর হৃদয় আবেগে পূর্ণ ছিল। তিনি সম্ভবত কখনো কল্পনাও করেননি যে এমন একটি দৃশ্যের সম্মুখীন হবেন। 

যুবতীটি স্বচক্ষে দেখল, কীভাবে একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সদ্ভাবের এক অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সেখানে শত শত মানুষ একসঙ্গে খেতে বসেছিল। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আন্তরিকভাবে খাবার তৈরি ও পরিবেশনে অংশ নিচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে যুবতীটি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হলো। তার মনে হলো, প্রতিষ্ঠানটি মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ঘৃণা ও বৈষম্যের অদৃশ্য প্রাচীর ভেঙে ফেলার এক নীরব প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।    

তরুণীটির মুখের অভিব্যক্তি ও চোখের আবেগ যেন বলছিল যে, মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা ও স্নেহ থাকলে ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা দূরত্ব তৈরি করতে পারে না। বরং, এই বৈচিত্র্যই সবাইকে একটি বড় পরিবারের মতো একত্রিত করতে পারে।

এই উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল কেরালার বিশিষ্ট ইসলামী পণ্ডিত, সমাজ সংস্কারক এবং শিক্ষাবিদ কে. টি. মনু মুসলিয়ারের আদর্শ ও স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে। তাঁর জীবদ্দশায়, কে. টি. মনু মুসলিয়ার কেরালার একটি সুপরিচিত সংগঠন ‘সমস্তা কেরালা ইসলাম মাতা বিদ্যাবাস বোর্ড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করা নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে নৈতিক মূল্যবোধ, উত্তম চরিত্র, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। ইসলামী শিক্ষায়, নৈতিক ও চরিত্র গঠনের এই প্রক্রিয়াকে ‘তারবিয়্যাহ’ বলা হয়। 

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

আজ এই প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণের প্রতিটি দিক যেন তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনারই প্রতিফলন ঘটায়। একসঙ্গে রান্না করা, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া—যা সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসবকে প্রতিফলিত করে। ভারতের গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতির প্রধান সৌন্দর্য হলো এই যে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একে অপরের উৎসব, সুখ ও আনন্দ একসঙ্গে ভাগ করে নেয়। কেরালার এই প্রতিষ্ঠানটি সেই সম্প্রীতির এক সুন্দর উদাহরণ। এখানকার বৃহৎ গণ-রান্নাঘর এবং বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন ব্যবস্থা অনেকের মন জয় করেছে। এই রান্নাঘরে কাউকে তার ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় না। জাতি বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করা হয় না। এখানে হিন্দু, মুসলিম এবং খ্রিস্টান—এই তিনটি প্রধান সম্প্রদায় সম্পূর্ণ আন্তরিকতা ও আনন্দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে খাবার তৈরি করে। রান্না শেষ হলে, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের স্বেচ্ছাসেবকরা হাসিমুখে সবাইকে খাবার পরিবেশন করেন।

সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যটি হলো যখন শিশু, যুবক, বৃদ্ধ ও তরুণসহ সর্বস্তরের মানুষ কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই একসঙ্গে খেতে বসে। কেউ মহান নয়, কেউ ক্ষুদ্র নয়। মনে হয় যেন সকলেরই একই পরিচয়, সকল মানুষ সমান। যুবতীটি যখন নিজের চোখে এই দৃশ্য দেখল, তখন সে উপলব্ধি করল যে এটি কেবল তার ক্ষুধা মেটানোর একটি আয়োজন নয়। এটি ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ভ্রাতৃত্বের এক পবিত্র উৎসব যা মানুষের হৃদয়কে হৃদয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই ধরনের অনুভূতির সৌন্দর্য কথায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। 

২০২৬ সালের অক্টোবরের ঐতিহাসিক সম্মেলন: ঐক্য ও শান্তির বার্তা 


প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক অনুষ্ঠানগুলো এর ঐতিহ্য ও সামাজিক ভূমিকাকেও সুদৃঢ় করে। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে, প্রাঙ্গণে অত্যন্ত জাঁকজমক ও মর্যাদার সাথে ৩৭তম বার্ষিক উৎসব এবং ১৩তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল যে, এতে কেবল একটি ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষই অংশগ্রহণ করেননি। বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, চিন্তাবিদ এবং নেতারাও এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। মঞ্চ থেকে শান্তি, পারস্পরিক আস্থা, ঐক্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রত্যেক বক্তাই সমাজে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই অনুষ্ঠানটি সমগ্র অঞ্চল জুড়ে ভালোবাসা ও সদ্ভাবের এক নতুন আবহ সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয়। মনু মুসলিয়ার ইসলামিক কমপ্লেক্সের কার্যক্রম শুধু সম্মিলিত ভোজন বা সামাজিক মেলামেশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্যতম প্রধান শক্তি হলো একটি সুসংগঠিত ও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানটি আশার এক নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে অনাথ, গৃহহীন এবং অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের জন্য।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

নৈতিকতা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়: এটি শিশুদের আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ ও তারবিয়াত শিক্ষা দেয়। এর লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের সমাজের দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।  

বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাগত সুবিধা: প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার জন্য হিফজুল কুরআন কলেজ এবং জামিয়া রাহিমিয়া আরবি কলেজ পরিচালিত হয়। 

বহুভাষিক শিক্ষা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা: ছাত্রছাত্রীদের আরবি, ইংরেজি, উর্দু এবং মালয়ালমের মতো ভাষায় জ্ঞান প্রদান করা হয়। এছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানে আধুনিক শ্রেণীকক্ষ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণাগার, খেলার মাঠ, একটি বড় মসজিদ এবং হাজার হাজার মূল্যবান ও দুর্লভ বই সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। 

সক্রিয় ছাত্র সংগঠন:  মদনুল ফুসওয়াহা ছাত্র সমিতি (এমএফএসএ) শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বদানের দক্ষতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বিকাশের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। একইভাবে, প্রাক্তন ছাত্র ফেডারেশন (ওএসএফ), প্রাক্তনীদের একটি সংগঠন, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।


এই সকল প্রচেষ্টা প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং মানুষ গড়ার এক সুন্দর পরিবেশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছে।

মানবতার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত: আজ বিশ্বের বহু মানুষের মধ্যে যেখানে বিভেদ, অবিশ্বাস ও তিক্ততার প্রাচীর রয়েছে, সেখানে কেরালার পালক্কাড জেলার মনু মুসলিমার ইসলামিক কমপ্লেক্স (এমএমআইসি–জামিয়া রাহমিয়া) মানবতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। 

এই প্রতিষ্ঠানটি একটি সহজ কিন্তু গভীর সত্য শিক্ষা দেয় বলে মনে হয়—মানবতার ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই। ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য বৈষম্যে নয়, বরং ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধায় নিহিত।

সেই তরুণীর বিস্ময়ভরা চোখ এবং উপস্থিত মানুষদের অকৃত্রিম আন্তরিকতা প্রমাণ করে যে, ভারতের প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য। প্রকৃত মানবিক সম্পর্ক তখনই গড়ে ওঠে, যখন ভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষ একই সমাজের সদস্য হিসেবে একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশীদার হয়।

কেরালার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সেই আদর্শকে শুধু কথায় নয়, বরং দৈনন্দিন কাজকর্ম ও আচরণের মাধ্যমেও প্রকাশ করেছে। কেরালার এই প্রতিষ্ঠানটির কাহিনী আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে শেখাই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা এবং ভ্রাতৃত্বই সমাজকে একত্রিত করে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধন।


শেহতীয়া খবৰ