কলকাতা:
বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সন্দেহ করে ৮৭ দিন আটক থাকার পর অবশেষে মঙ্গলবার মুক্তি পেলেন উত্তর দিনাজপুরের ৭০ বছরের বাসিন্দা জলিল আখতার। ইসলামপুরের একটি আদালত তাঁকে জামিন দেওয়ার সময় জানায়, তাঁকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ প্রমাণ করার মতো কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ তদন্তকারী সংস্থা আদালতে পেশ করতে পারেনি।
উত্তর দিনাজপুরের বাজগাঁও-২ পঞ্চায়েত এলাকার বাগরাই গ্রামের বাসিন্দা জলিল আখতার পেশায় দিনমজুর। তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পরিবারের অভিযোগ, ২০ জুন ডালখোলা পুলিশের একটি দল তাঁকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে বাবার নামে ১৯৬৭ সালের জমির দলিল-সহ একাধিক নথি পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
বিদেশি নাগরিকদের বৈধ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশ ও অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য Foreigners Act-এর ১৪ নম্বর ধারায় জলিলকে গ্রেফতার করা হয়।ইসলামপুর আদালতের জামিনের নির্দেশের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সমীরুল ইসলাম পুলিশের ‘বাড়াবাড়ি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ধরার নামে নাগরিকদের হয়রানি ও কারাবন্দি করা হচ্ছে।
PTI-এর আগের প্রতিবেদনে জলিলের পরিবারের দাবি ছিল, প্রথমে তাঁকে উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ার নিজামপুর হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। পরে তাঁকে শিলিগুড়ির কাছে ফুলবাড়ির একটি ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে বিএসএফের হাতে তুলে দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করার একাধিক চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বিএসএফ তাঁর নথিপত্র পরীক্ষা করার পর তাঁকে বাংলাদেশে পাঠায়নি এবং ফের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয় বলে পরিবারের দাবি।
ইসলামপুরের ACJM জেমসেদ শেখ তাঁর জামিনের নির্দেশে বলেন, “কেস ডায়েরিতে থাকা নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্ত নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করায় তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।”আদালত আরও জানায়, ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবির সমর্থনে জলিল যে নথিগুলি জমা দিয়েছেন, তার মধ্যে পরপর একাধিক SIR-এর ভোটার তালিকায় তাঁর নাম, ২০২৬ সালের চূড়ান্ত SIR তালিকা, আধার কার্ড এবং রেশন কার্ড রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার যাচাইয়ে ওই নথিগুলি সংশ্লিষ্ট সরকারি ডেটাবেসে থাকা রেকর্ডের সঙ্গে মিলে গেছে বলে আদালত উল্লেখ করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে কেস ডায়েরিতে থাকা তথ্য থেকে ওই নথিগুলিকে জাল বা ভুয়ো বলে প্রমাণিত করা যাচ্ছে না। বরং তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি ডেটাবেসে ওই রেকর্ডগুলির অস্তিত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, জামিনের আবেদন বিবেচনা করার সময় জলিল আখতার ভারতীয় নাগরিক কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ছে না। নাগরিকত্বের বিষয়টি আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নির্ধারণ করতে হবে।
জামিনের বিরোধিতা করে সরকারি আইনজীবী দাবি করেন, অভিযোগের প্রকৃতি এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়া হলে রাজ্যের নিরাপত্তা ও স্বার্থের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।তবে আদালত ১০ হাজার টাকার বন্ডে জামিন মঞ্জুর করে জানায়, অভিযুক্ত তাঁর নাগরিকত্বের ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ দিতে পারেননি—শুধুমাত্র এই কারণ দেখিয়ে তাঁকে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা যায় না।
জলিলের মুক্তির পর তৃণমূল সাংসদ সমীরুল ইসলাম আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নাগরিকত্বের নথি যাচাই না করেই কেন তাঁকে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে হয়রানির মুখে পড়তে হল।সমীরুল ইসলাম সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র সন্দেহের কারণে একজন দরিদ্র মানুষকে এমন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এই ঘটনার জন্য কে দায়ী এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এই ঘটনা সামনে এল এমন এক সময়ে, যখন গত বছরের জুনে বীরভূমের মুরারইয়ের ছয় বাসিন্দাকে—দুই মহিলা ও তিন নাবালক-সহ—অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে দিল্লি থেকে আটক করে এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁদের ধাপে ধাপে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।
গর্ভবতী সোনালি খাতুন ও তাঁর আট বছরের ছেলে সাবিরকে গত ডিসেম্বর মাসে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। অন্যদিকে তাঁর স্বামী দানিশ শেখ এবং সুইটি বিবি ও তাঁর দুই নাবালক ছেলে কুরবান ও ইমামকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়—বাংলাদেশে পাঠানোর এক বছরেরও বেশি সময় পরে।