মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ইউএফও সংক্রান্ত রিপোর্ট নথিভুক্ত থাকা পূর্বে গোপন রাখা ফাইলের প্রথম দফা প্রকাশ করেছে
ওয়াশিংটন, ডি.সি:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রথম দফায় পূর্বে গোপন রাখা কিছু নথি প্রকাশ করেছে, যেখানে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু(ইউএফও) সংক্রান্ত বিভিন্ন রিপোর্ট নথিভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বহু মানুষ কয়েক দশক ধরে এই তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
“শ্রেণিবদ্ধ নথির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ফাইলগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকভাবেই নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে — এবং এখন সময় এসেছে আমেরিকার জনগণ নিজেরাই এগুলো দেখুক,” এক্স-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেন পিট হেগসেথ ।
উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বাজ অলড্রিন— অ্যাপোলো ১১-এর চন্দ্র অবতরণ এর সেই মহাকাশচারী, যিনি চাঁদে হাঁটা দ্বিতীয় ব্যক্তি। তিনি ১৯৬৯ সালের এক ডিব্রিফিংয়ে জানান, চাঁদের পৃষ্ঠের কাছাকাছি একটি “বেশ বড়” বস্তু দেখেছিলেন এবং একটি “উজ্জ্বল আলোর উৎস” লক্ষ্য করেছিলেন, যা ক্রু সদস্যদের কাছে লেজারের মতো মনে হয়েছিল।
লিখিত রিপোর্টের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে সামরিক ক্যামেরায় ধারণ করা একাধিক ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে পূর্ব চীন সাগর-এর ওপর ফুটবল আকৃতির একটি বস্তু দেখা যাওয়ার ঘটনা, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর আকাশে বিভিন্ন গতিতে অনিয়মিতভাবে চলমান আলোর বিন্দুর ভিডিও।
এই প্রকাশনা আসে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে ইউএফও— যা এখন অজ্ঞাত অস্বাভাবিক ঘটনা নামে পরিচিত— সম্পর্কিত সরকারি নথি শনাক্ত, গোপনীয়তা প্রত্যাহার এবং প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি পৃথিবীর বাইরে ভিনগ্রহের প্রাণের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, জনসাধারণের ব্যাপক আগ্রহের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের কাছে ভিনগ্রহের প্রাণী বা তাদের মহাকাশযান সম্পর্কিত তথ্য আছে কি না— সে বিষয়ে মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
গত মাসে জ্যারেড আইজ্যাকম্যান, নতুন জাতীয় মহাকাশ ও বিমান প্রশাসন প্রশাসক, সংস্থার স্বচ্ছতার পক্ষে কথা বলেন। তিনি জানান, মহাকাশে ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনাও মহাকাশ অভিযান চালানোর একটি কারণ।তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, “কোনো এক সময় আমরা এমন কিছু খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি, যা ইঙ্গিত করবে যে আমরা মহাবিশ্বে একা নই।”
তবে শুক্রবার প্রকাশিত প্রথম ১৬২টি ফাইলে শত শত পৃষ্ঠা থাকলেও, সেগুলোতে নতুন বা চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, “এই ফাইলগুলোর তথ্য দেখে জনগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।”
এই নথিগুলোর মধ্যে পুরনো স্টেট ডিপার্টমেন্টের কেবল, ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন এর নথি এবং জাতীয় মহাকাশ ও বিমান প্রশাসন-এর মানববাহী মহাকাশ অভিযানের প্রতিলিপিও রয়েছে। কয়েক দশক আগের কিছু নথিতে ইউএফও দেখার অস্পষ্ট প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণও রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৭ সালের একটি গোপন রিপোর্টে প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ এর এক পাইলট ও নেভিগেটর আকাশে একটি রহস্যময় “উজ্জ্বল কমলা বস্তু” দেখার কথা জানান। কয়েক সেকেন্ড পর সেটি মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায়।
আরও সাম্প্রতিক এক নথিতে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এক ড্রোন পাইলট ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনকে জানান, তিনি আকাশে একটি সরলরেখার মতো বস্তু দেখেছিলেন, যার আলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে আলোর ভেতরে আলাদা স্তর দেখা যাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ড পর সেটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়।
এদিকে, অলড্রিনই একমাত্র মহাকাশচারী নন যিনি অদ্ভুত কিছু দেখার কথা বলেছেন। অ্যাপোলো ১৭ অভিযানের একটি ছবিতে ত্রিভুজাকারে থাকা তিনটি আলোর বিন্দু দেখা যায়। পেন্টাগন জানায়, “এই অস্বাভাবিকতার প্রকৃতি নিয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য নেই,” তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে এটি একটি “বাস্তব বস্তু” হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, এটি কেবল প্রথম ধাপের প্রকাশনা। হোয়াইট হাউস, জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয়,জ্বালানি বিভাগ, ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন এবং ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহযোগিতায় আরও নথি ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে।তবে পেন্টাগন স্বীকার করেছে, নিরাপত্তা যাচাই করা হলেও অনেক নথির অস্বাভাবিক ঘটনার বিশ্লেষণ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে পেন্টাগনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ভিনগ্রহের কার্যকলাপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অধিকাংশ ইউএফও দেখার ঘটনা আবহাওয়া, বেলুন, পাখি বা স্যাটেলাইট ভুল শনাক্ত করার ফল।
একই বছরে সকল-ডোমেইন অসঙ্গতি সমাধান অফিসের আরেকটি রিপোর্টে বলা হয়, মার্কিন সরকার কখনোই গোপনে ভিনগ্রহের প্রযুক্তি বা প্রাণী লুকিয়ে রাখেনি। নিউ মেক্সিকো মরুভূমিতে ভিনগ্রহের প্রাণী ও মহাকাশযান রাখা আছে— এমন গুজবও ভিত্তিহীন বলে জানানো হয়।
এই রিপোর্টগুলো প্রকাশের আগে সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডেভিড গ্রুশ দাবি করেছিলেন, মার্কিন সরকার বহু দশক ধরে একটি গোপন ইউএফও কর্মসূচি পরিচালনা করেছে এবং সেখানে “অমানবিক” জীবের সন্ধান পাওয়া গেছে।