শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর থেকেই একের পর এক বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে নতুন সরকার। আর সেই সিদ্ধান্তগুলির মধ্যেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্ন থেকে আবারও ঐতিহ্যবাহী মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাকে।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মহাকরণে জোরকদমে প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। বহু বছর ধরে আংশিক ব্যবহারের পর এবার গোটা ভবনটিকেই আধুনিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই ভবনটি একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন পূর্ত দফতর (PWD)-এর ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। প্রথম পর্যায়ে মহাকরণের অন্তত ২৮টি ঘর চিহ্নিত করা হয়েছে সংস্কারের জন্য। দ্রুত গতিতে চলছে রংয়ের কাজ, আধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন, বৈদ্যুতিক পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থা তৈরির কাজ।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য আলাদা দফতর তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর জন্য বিশেষ চেম্বার, বৈঠকখানা এবং প্রশাসনিক কন্ট্রোল রুম তৈরির প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক কাজ যাতে নির্বিঘ্নে চালানো যায়, তার জন্য অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল ফাইল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি কর্মীদের জন্যও নতুনভাবে বসার ব্যবস্থা ও আধুনিক অফিস অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক বার্তাও। ব্রিটিশ আমল থেকে দীর্ঘদিন বাংলার প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র ছিল মহাকরণ। স্বাধীনতার পরও বহু দশক ধরে সেখান থেকেই রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালিত হয়েছে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক সুবিধা ও আধুনিক পরিকাঠামোর কারণে নবান্নে স্থানান্তর করা হয় রাজ্য সরকারের সদর দফতর। এবার সেই পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে বিজেপি একদিকে যেমন বাংলার ঐতিহাসিক আবেগকে স্পর্শ করতে চাইছে, তেমনই নিজেদের প্রশাসনিক দর্শনেরও প্রতীকী বার্তা দিতে চাইছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এদিকে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক তরজা। বিরোধীদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র প্রতীকী রাজনীতির জন্য এত বড় প্রশাসনিক বদল আনা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, মহাকরণ বাংলার ইতিহাস ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যের অংশ, তাই সেখান থেকেই নতুন যুগের সূচনা করতে চায় তারা। ইতিমধ্যেই প্রশাসনের অন্দরে জোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক মহলেও চর্চা তুঙ্গে উঠেছে।
নবান্ন থেকে মহাকরণে প্রশাসনের প্রত্যাবর্তন ঘিরে এখন রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার এই নতুন অধ্যায় আগামী দিনে বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।