দেবকিশোর চক্রবর্তী
হাকিমপুর সীমান্ত থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি অখ্যাত জনপদ। চারপাশে সবুজ মাঠ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতি আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে একটি ছোট নদী। দিনের বেলায় নদীটি এলাকার সাধারণ জীবনযাত্রার অংশ হলেও রাত নামলেই তার চেহারা বদলে যায়। স্থানীয়দের দাবি, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এই নদীপথ দিয়েই বছরের পর বছর ধরে চলছে অবৈধ সীমান্ত পারাপার।
সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের বড় একটি অংশে এখনও কার্যকর কাঁটাতারের বেড়া নেই। কোথাও নদী, কোথাও জলাভূমি এবং কোথাও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই সক্রিয় হয়ে উঠেছে অবৈধ পারাপারকারী ও চোরাকারবারি চক্র। অভিযোগ, গভীর রাতে ছোট নৌকা কিংবা হাঁটুপানি নদী পেরিয়ে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যও পাচার হচ্ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড়ে সন্দেহজনক গতিবিধি চোখে পড়ে। মাঝেমধ্যে অচেনা লোকজনকে নদীপথ ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। তাদের আশঙ্কা, এসব চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারির কথা বলা হলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদীপথের বিস্তৃত অংশে পর্যাপ্ত নজরদারি সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদীর জলস্তর বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন নদীপথে চলাচল বাড়ে এবং অবৈধ পারাপারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া না থাকা এবং নদীপথের ভৌগোলিক সুবিধা অবৈধ পারাপারকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে। শুধু অনুপ্রবেশ নয়, এর সঙ্গে চোরাচালান, জাল মুদ্রা পাচার কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কাও থেকে যায়। ফলে বিষয়টি কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
এলাকাবাসীর দাবি, নদীপথে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, অতিরিক্ত টহল এবং রাতের নজরদারি বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
নদীর শান্ত জলের আড়ালে তাই এখনও লুকিয়ে রয়েছে সীমান্তের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। দিনের আলোয় নিস্তব্ধ এই জনপদ রাতের অন্ধকারে যেন পরিণত হয় অবৈধ পারাপারের এক গোপন করিডরে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই পথ বন্ধ করে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হবে।