নয়াদিল্লি
পাহালগামের বৈসারান প্রান্তরে ঘটে যাওয়া নারকীয় জঙ্গি হামলার এক বছর পরও মানুষের মনে অমলিন হয়ে রয়েছে পোনিওয়ালা আদিল হুসেন শাহের সাহসিকতা। ২৬ জন নিরীহ ভারতীয়ের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই হামলার সময় পর্যটকদের বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। তাঁর আত্মত্যাগ ও মানবিকতার স্বীকৃতি হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীর সরকার দক্ষিণ কাশ্মীরের একটি সরকারি স্কুলের নাম তাঁর নামে উৎসর্গ করেছে।
আগে যার নাম ছিল হাপাতনার হাই স্কুল, সেই প্রতিষ্ঠানটির নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘শহিদ আদিল মেমোরিয়াল হাই স্কুল’। অনন্তনাগ জেলায় আয়োজিত নামকরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী সাকিনা ইট্টু।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জইশ-ই-মোহাম্মদ জঙ্গিরা মনোরম বৈসারান প্রান্তরে পর্যটকদের উপর গুলি চালালে আদিল হুসেন শাহ নিহত হন। এই হামলা গোটা দেশকে স্তম্ভিত করেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জঙ্গিরা পর্যটকদের ধর্ম জিজ্ঞাসা করছিল এবং অমুসলিমদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছিল।
আদিল, যিনি অন্যান্য পোনিওয়ালাদের সঙ্গে পর্যটকদের উপত্যকায় নিয়ে গিয়েছিলেন, জঙ্গিদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি নাকি জঙ্গিদের অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা পর্যটকদের ক্ষতি না করে এবং মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে তারা কাশ্মীরিদের অতিথি। কিন্তু জঙ্গিরা তাঁর অনুরোধ না শুনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।
প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আদিলের এই সাহসিকতা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। অনেকেই তাঁকে কাশ্মীরের আতিথেয়তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
নামকরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী সাকিনা ইট্টু বলেন, আদিলের সাহস ও আত্মত্যাগ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নিরীহ পর্যটকদের বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রাখার সিদ্ধান্তকে তিনি অসাধারণ সাহস ও মানবতার উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন।
হামলার রাতেই ঘটনাস্থলে যাওয়ার স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী বলেন, সেই মর্মান্তিক ঘটনা সকলের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি আরও জানান, আদিলের শহিদত্বকে সম্মান জানানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন তাঁর আত্মত্যাগ স্মরণ রাখে, সেই উদ্দেশ্যেই স্কুলটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
সাকিনা ইট্টু বলেন, “মা-বাবার জন্য এই শোক অসহনীয়, এর কোনো বিকল্প নেই। চাকরি দেওয়া হোক বা স্কুলের নামকরণ করা হোক, তাদের যে দুঃখ তা কেউ পূরণ করতে পারবে না। মুখ্যমন্ত্রী যখন পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তখনই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে পাশের স্কুলটির নাম আদিলের নামে রাখা হবে। মানুষকে বাঁচাতে তিনি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, এই পদক্ষেপ শুধু প্রতীকী নয়, বরং ছাত্রছাত্রীদের সাহস, সেবা ও মানবতার মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আদিলের নাম যুক্ত থাকলে তাঁর উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাতে থাকবে।
সাকিনা ইট্টু নিজেও সন্ত্রাসবাদের শিকার পরিবারের সদস্য। তাঁর বাবা, যিনি একজন বিধায়ক ছিলেন, ১৯৯০-এর দশকে জঙ্গিদের হাতে নিহত হন। এরপর তাঁকে চিকিৎসাশাস্ত্রের পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি ফিরে বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করতে হয়েছিল।
এর আগেই আদিল শাহের সাহসিকতায় অনুপ্রাণিত হয়ে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁর পরিবারের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করেছিল। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন বাড়িটির উদ্বোধন সম্প্রতি পাহালগাম জঙ্গি হামলার বর্ষপূর্তিতে করা হয়।
শহিদদের নামে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণের নির্দেশ প্রথম জারি করা হয়েছিল অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর গভর্নর শাসন চলাকালীন। তবে ওমর আবদুল্লাহর নির্বাচিত সরকারের আমলে এটাই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত। আদিল শাহের সম্মানে একটি স্কুলের নামকরণের সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়েছিল।