“চিহ্নিত করো, তালিকা থেকে বাদ দাও, দেশছাড়া করো” — অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে পশ্চিমবঙ্গে কড়া অভিযান শুরু
দেবকিশোর চক্রবর্তী
রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে এবার আরও কড়া অবস্থান নিল বিজেপি সরকার। ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে বার্তা দিয়েছিলেন—বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে দেশে ফেরত পাঠানো—তা এবার বাস্তবায়নের পথে। বুধবার নবান্নে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করলেন, রাজ্যে আজ থেকেই কার্যকর হচ্ছে “চিহ্নিত করো, তালিকা থেকে বাদ দাও, দেশছাড়া করো” নীতি।
রাজ্য সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলিতে বেআইনি অনুপ্রবেশ, জাল নথি তৈরি এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এবার সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য।
বুধবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএসএফের শীর্ষ আধিকারিক রবিন কুমার, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত, রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার এবং স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ। বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত চালু করা।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ডিজিপি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত সংলগ্ন সমস্ত থানাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—দেশ ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে আজ থেকেই এই আইন কার্যকর করা হল।” তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র সীমান্তে নজরদারি বাড়ালেই হবে না, প্রশাসনের প্রত্যেক স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজ্য সরকারের তরফে আরও জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৪ মে কেন্দ্র সরকার রাজ্যকে একটি নির্দেশিকা পাঠিয়েছিল। সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। তৎকালীন তৃণমূল সরকার সেই নির্দেশিকা কার্যকর করেনি বলেই অভিযোগ বিজেপির। পাশাপাশি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়েও আগের সরকারের বিরোধিতার প্রসঙ্গ তুলে বর্তমান সরকার জানিয়েছে, এবার নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করার পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সূত্রে খবর, সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়াতে বিএসএফকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমিও দেওয়া হবে। বহু জায়গায় জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সীমান্ত সুরক্ষার কাজ আটকে ছিল। এবার সেই সমস্যারও সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একদিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী এলাকার ভোট রাজনীতিতেও বড় বার্তা দিতে চাইছে সরকার। বিজেপির বক্তব্য, রাজ্যে বেআইনি অনুপ্রবেশের কারণে জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলেছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তাই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে বিরোধীদের একাংশের দাবি, এই ধরনের পদক্ষেপের নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রকৃত নাগরিকদের হয়রানির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও সরকারের বক্তব্য, শুধুমাত্র যাচাই-বাছাই এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও নিরীহ নাগরিককে হয়রানি করা হবে না।
রাজনৈতিক তরজা যাই থাকুক না কেন, “চিহ্নিত করো, তালিকা থেকে বাদ দাও, দেশছাড়া করো” নীতি চালুর ঘোষণার পর রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সীমান্তবর্তী থানাগুলিকে বিশেষ নির্দেশ পাঠানো হয়েছে এবং পুলিশ-বিএসএফ যৌথভাবে কাজ করবে বলেও জানানো হয়েছে। ফলে আগামী দিনে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যুতে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ বাড়তে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।