সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ঘিরে নতুন উত্তেজনা, বিএসএফের কাজে বাধা নিয়ে ফের মুখোমুখি ভারত-বাংলাদেশ
দেবকিশোর চক্রবর্তী
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সীমান্ত সুরক্ষা প্রকল্পে গতি আনতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবার আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী-এর হাতে জমি হস্তান্তর শুরু করেছে। কিন্তু এই পদক্ষেপের পরই সীমান্তের একাধিক এলাকায় নতুন করে আপত্তি ও বাধার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর বিরুদ্ধে।
বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিএসএফ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সূচনা করেন। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, প্রথম দফায় ২৭ কিলোমিটার জমি বিএসএফকে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হবে এবং বাকি ৯ কিলোমিটার জমিতে বিএসএফ ফাঁড়ি ও পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, পূর্ববর্তী সরকারের “অসহযোগিতা”-র কারণে দীর্ঘদিন সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ আটকে ছিল। তাঁর বক্তব্য, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, জাল নোট চক্র, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া সম্পূর্ণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যে প্রায় ২২০০ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার এলাকায় ইতিমধ্যেই বেড়া তৈরি হয়েছে, কিন্তু এখনও প্রায় ৬০০ কিলোমিটার অংশ বেড়াবিহীন রয়ে গিয়েছে। এদিকে, আজ ২২ মে সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় বেড়া নির্মাণ ও জমি মাপজোকের কাজ ঘিরে ফের আপত্তি তুলেছে বিজিবি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কয়েকটি অঞ্চলে বিএসএফের কাজের বিরোধিতা করা হয়েছে বলে খবর। অতীতেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট-সহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ঘিরে বিএসএফ ও বিজিবি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল।
ভারত-বাংলা সীমান্ত
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলিতিও এই ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সীমান্তে বেড়া নির্মাণের আগে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে সবক্ষেত্রে অবহিত করছে না। আবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, সীমান্তে একতরফাভাবে বেড়া নির্মাণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হচ্ছে এবং সীমান্ত সুরক্ষার জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে বেড়া নির্মাণের ফলে চোরাচালান, পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়া যায়।
বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় যে প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাব ছিল, নতুন প্রশাসনের অধীনে তা অনেকটাই দূর হয়েছে। ফলে সীমান্ত সুরক্ষা সংক্রান্ত কাজ দ্রুত এগোবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিএসএফ সীমান্তে প্রহরারত
চ্যাংড়াবান্ধা-সহ উত্তরবঙ্গের একাধিক সীমান্ত এলাকায় ইতিমধ্যেই জমি মাপজোক ও বেড়া নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের একাংশের মতে, বেড়া নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে অনুপ্রবেশ ও অপরাধ অনেকটাই কমবে। যদিও অন্যদিকে সীমান্তের ওপারের আপত্তি এবং বিজিবির বাধা ঘিরে পরিস্থিতি এখনও স্পর্শকাতর বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।