নয়া দিল্লি
বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে ভারতের ওষুধ শিল্পে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষত ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। শিল্প মহলের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খুব শিগগিরই সাধারণ রোগীদের উপর তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নিয়ে। প্রতিদিনের ব্যবহারিক ওষুধ, বিশেষ করে জ্বরের ট্যাবলেট Paracetamol-এর দাম বাড়তে পারে বলে জানাচ্ছেন প্রস্তুতকারকরা। শুধু তাই নয়, সংক্রমণজনিত রোগ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। এর ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চিন্তার কারণ।
শিল্প সূত্রের দাবি, ওষুধ তৈরির মূল উপাদান, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (API), সলভেন্ট ও এক্সিপিয়েন্ট, এর দাম গত কয়েক সপ্তাহে ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, প্যারাসিটামল তৈরির কাঁচামালের দাম কেজি প্রতি প্রায় ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকায় পৌঁছেছে। এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।
এই পরিস্থিতিতে হিমাচলপ্রদেশ ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লিখে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বর্তমান নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া অনেক সংস্থার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্যারাসিটামলসহ বহু ওষুধই ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনশিয়াল মেডিসিনস (NLEM)-এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই ওষুধগুলির সর্বোচ্চ মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সেই নির্ধারিত দামে উৎপাদন বজায় রাখা ক্রমশই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, শুধুমাত্র কাঁচামাল নয়, প্যাকেজিং ও পরিবহণ খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্লিস্টার প্যাকের জন্য অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, বোতলের জন্য প্লাস্টিক ও কাচের কন্টেনারের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে ব্যাঘাত ঘটছে, ফলে পরিবহণ খরচ বাড়ছে এবং পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ছোট ও মাঝারি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির উপর। কারণ, এই সংস্থাগুলি সাধারণত কম লাভে কাজ করে এবং নির্দিষ্ট মূল্যে সরবরাহের চুক্তিতে আবদ্ধ থাকে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক সংস্থা উৎপাদন কমানো বা কিছু ওষুধের উৎপাদন বন্ধ করার কথাও ভাবছে।
এর প্রভাব পড়তে পারে হাসপাতাল, সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প এবং সাধারণ ওষুধের দোকানগুলিতে। যদি পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে খুব শিগগিরই সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে, এমনটাই আশঙ্কা শিল্প মহলের।