“হুঙ্কারের পরেই পিছু হটা! ফলতায় ‘পুস্পা’ জাহাঙ্গীরের ওয়াকওভার ঘিরে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ”
দেবকিশোর চক্রবর্তী
ফলতা বিধানসভা অঞ্চলের রাজনীতিতে মঙ্গলবার এক নাটকীয় মোড়। বহুল চর্চিত ও বিতর্কিত মুখ, স্বঘোষিত ‘পুস্পা’ জাহাঙ্গীর খান আচমকাই প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করে কার্যত বিনা যুদ্ধে মাঠ ছেড়ে দিলেন। যে জাহাঙ্গীর খান এতদিন এলাকায় নিজের প্রভাব, শক্তি ও দাপটের প্রদর্শন করে বিরোধীদের কড়া বার্তা দিতেন, সেই তিনিই ভোটের লড়াই শুরুর আগেই পিছিয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক নয়, এর পেছনে রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক বার্তার প্রভাব। বিশেষ করে সম্প্রতি ফলতায় নির্বাচনী প্রচারে এসে রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে ভাষায় জাহাঙ্গীর কে আক্রমণ করেছিলেন, তার অভিঘাত যে গভীর ছিল তা এখন স্পষ্ট।
সভামঞ্চ থেকে শুভেন্দু সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন— “জাহাঙ্গীরের খেল খতম। এবার ওর ঠিকানা হবে জেল হাজত।” শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, প্রশাসনিক কড়াকড়ির ইঙ্গিতও ছিল সেই বক্তব্যে। কারণ রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী হিসেবেও তাঁর বক্তব্যের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সেই হুঙ্কারের মাত্র দু’দিনের মধ্যেই জাহাঙ্গীরের প্রার্থী পদ প্রত্যাহার রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
এরপর ফলতায় যান বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বরাবরের মতোই তাঁর বক্তব্যে ছিল ব্যঙ্গ, কটাক্ষ এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মিশেল। তিনি নাম না করে জাহাঙ্গীর খান ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, “সাহস থাকলে সম্মুখ সমরে আসুন। মানুষ ঠিক করে দেবে কে কত বড় শক্তি।” তাঁর এই ‘নরমে-গরমে’ রাজনৈতিক বার্তা সভামঞ্চে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বিরোধীদের ধারাবাহিক আক্রমণ এবং প্রশাসনিক চাপে জাহাঙ্গীর খান বুঝতে পারেন যে এবার ভোটের লড়াই আগের মতো সহজ হবে না। এতদিন যাঁকে ফলতার ‘বেতাজ বাদশা’ বলা হত, সেই জাহাঙ্গীরের এই সরে দাঁড়ানো কার্যত বিরোধীদের কাছে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেই ধরা পড়ছে।তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক চাপই নয়, স্থানীয় স্তরেও জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছিল বলে দাবি বিরোধীদের। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দাপটের রাজনীতি, ভয় দেখানো এবং সংগঠনের ভিতরে অসন্তোষ— সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
অন্যদিকে শাসকদলের অন্দরেও এই ঘটনাকে ঘিরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কারণ জাহাঙ্গীর খানকে ঘিরে বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণ নির্বাচনের আগে দলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছিল। ফলে তাঁর সরে দাঁড়ানোকে কেউ কেউ “ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল” বলেও ব্যাখ্যা করছেন।তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়— যিনি এতদিন প্রকাশ্যে নিজেকে ‘পুস্পা’ বলে পরিচয় দিতেন, “ঝুঁকেগা নেহি” ধরনের দাপুটে বার্তা দিতেন, তিনি হঠাৎ কেন ভোটযুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিলেন? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ফলতার চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনাকে বিজেপি ইতিমধ্যেই “ভয়ের জয়” বলে তুলে ধরতে শুরু করেছে। তাদের বক্তব্য, বিরোধীদের কড়া অবস্থান এবং মানুষের ক্ষোভের মুখে জাহাঙ্গীর খান আর লড়াইয়ের সাহস দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে শাসকদল যদিও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে দলের অন্দরমহলে যে চাপ তৈরি হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সব মিলিয়ে ফলতার এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল, এবারের নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়, এটি প্রভাব বনাম প্রতিরোধেরও যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে প্রথম বড় মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা যে জাহাঙ্গীর খানের শিবিরে লাগল, তা বলাই যায়।