‘গিরগিটির থেকেও ভয়ঙ্কর’, দলবদলুদের নিশানা করে নেত্রী মমতা নতুন কবিতায় দিলেন বিস্ফোরক বার্তা
দেবকিশোর চক্রবর্তী
ক্ষমতা হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও তাঁর কলমকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলত্যাগীদের আচরণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেন নতুন কবিতা, ‘গিরগিটি’। আর সেই কবিতাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক চর্চা।
একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সুবাদে বহু নেতা-নেত্রী, সুবিধাভোগী এবং স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা নেত্রীর চারপাশে ভিড় জমিয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের সময় যাঁরা সামনে থেকে নেতৃত্ব পেয়েছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদ ও প্রভাব ভোগ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে রাজনৈতিক অবস্থান বদলে অন্য শিবিরে চলে যান। বিশেষ করে বিধানসভা নির্বাচনের ধাক্কার পর একাংশ নেতার দলত্যাগ ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক।
অন্যদিকে, যাঁরা আন্দোলনের প্রথম দিন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ছিলেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের সঙ্গী ছিলেন, তাঁদের অনেকেই থেকে গিয়েছেন নেপথ্যে। কিন্তু রাজনৈতিক দুর্দিনেও তাঁরা দল ছাড়েননি। এই প্রেক্ষাপটেই মমতার নতুন কবিতা যেন এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
বুধবার সন্ধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা কবিতার প্রথম লাইনেই তিনি লিখেছেন, “গিরগিটির থেকেও ভয়ঙ্কর।” এই একটি লাইনই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা উসকে দিয়েছে। কার উদ্দেশে এই বার্তা? কাদের ‘রং বদলানো’ আচরণকে কটাক্ষ করলেন তিনি? তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা।
কবিতার বিভিন্ন লাইনে বারবার উঠে এসেছে চরিত্র বদল, অবস্থান পরিবর্তন এবং অর্থের বিনিময়ে আদর্শ বিসর্জনের প্রসঙ্গ। মমতা লিখেছেন,
“আর কত নেবে চরিত্র বদলাতে?
আর কত চাও? নিজেদের ভোল বদলাতে?”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই কবিতার মাধ্যমে দলবদলু নেতাদের একহাত নিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। যাঁরা একসময় দলের সুবিধা ভোগ করে পরে রাজনৈতিক স্বার্থে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশেই এই বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগেও পরাজয়ের পর লেখা তাঁর আরেকটি কবিতায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নিশানা করার অভিযোগ উঠেছিল। তবে এবার কবিতার ভাষা আরও ব্যক্তিগত, আরও তীক্ষ্ণ। কারণ, এখানে আক্রমণের কেন্দ্রে রয়েছেন একসময় তাঁরই ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত নেতারা।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কবিতার মাধ্যমে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, দলের কর্মীদেরও একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন, আদর্শের রাজনীতিতে বিশ্বাসঘাতকতার কোনও স্থান নেই। ক্ষমতা থাকলে পাশে থাকা আর দুর্দিনে সরে যাওয়া নেতাদের প্রতি তাঁর হতাশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রতিটি পংক্তিতে।
তৃণমূলের অন্দরে এই কবিতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। একাংশের মতে, এটি দলীয় কর্মীদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা। আবার বিরোধীদের দাবি, এই কবিতা আসলে দলের ভিতরে ভাঙনের ইঙ্গিত বহন করছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে এখনও শব্দের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দিতে সিদ্ধহস্ত, তা আরও একবার স্পষ্ট হল তাঁর ‘গিরগিটি’ কবিতায়। ক্ষমতার রাজনীতিতে রং বদলের সংস্কৃতিকে আক্রমণ করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত আনুগত্যের চেয়ে আদর্শ এবং সংগ্রামের মূল্যই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।