পুশব্যাকের অপেক্ষায় ‘বিদেশি’ অতিথিরা, মালদহের হোল্ডিং সেন্টারে মাছ-মাংস-ডিমের এলাহি বন্দোবস্ত

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 11 h ago
পুশব্যাকের অপেক্ষায় ‘বিদেশি’ অতিথিরা, মালদহের হোল্ডিং সেন্টারে মাছ-মাংস-ডিমের এলাহি বন্দোবস্ত
পুশব্যাকের অপেক্ষায় ‘বিদেশি’ অতিথিরা, মালদহের হোল্ডিং সেন্টারে মাছ-মাংস-ডিমের এলাহি বন্দোবস্ত
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মালদহে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ হোল্ডিং সেন্টার। সেখানে তাঁদের অস্থায়ীভাবে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর (পুশব্যাক) প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত। তবে এই হোল্ডিং সেন্টারের থাকার ও খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কারণ, সেখানে থাকা ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে মাছ, মাংস, ডিম, সরু চালের ভাত, দেশি গমের রুটি থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য দুধ ও বেবি ফুডের মতো নানা সুবিধা।
 
উত্তরবঙ্গের প্রথম হোল্ডিং সেন্টারটি চালু হয়েছে মালদহের ইংলিশবাজার শহর সংলগ্ন বাগবাড়ির চন্দনপার্ক এলাকায়। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের বিপণন কেন্দ্রের একটি পাকা ও আধুনিক ভবনকে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবনের একাধিক কক্ষে সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থা রয়েছে, ফলে গরমের মধ্যেও সেখানে থাকা ব্যক্তিদের স্বস্তিতে থাকার সুযোগ মিলছে।
 
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে ওই হোল্ডিং সেন্টারে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা এবং ছয়জন শিশু ও কিশোর-সহ মোট নয়জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের পরিচয় যাচাই এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
 
মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন, হোল্ডিং সেন্টারে থাকা প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবার, পোশাক, স্বাস্থ্যবিধি এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা সেখানে রয়েছেন, তাঁরা প্রশাসনের হেফাজতে থাকায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেই তাঁদের দেখভাল করা হচ্ছে।
 
খাবারের আয়োজনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। বড়দের জন্য নিয়মিত ভাত, রুটি, মাছ, মাংস এবং ডিমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য দিনে চারবার দুধ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী বেবি ফুডও সরবরাহ করা হচ্ছে। রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। প্রশাসনের দাবি, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধির কথা মাথায় রেখেই খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়েছে।
 
শুধু খাবার নয়, হোল্ডিং সেন্টারে থাকা ব্যক্তিদের জন্য নতুন পোশাকও দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য সাবান, শ্যাম্পু-সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতে প্রবেশ করা এই মানুষগুলি আপাতত নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
 
নিরাপত্তার দিক থেকেও কোনও খামতি রাখা হয়নি। হোল্ডিং সেন্টার চত্বরে নিয়মিত মোতায়েন রয়েছেন তিনজন পুলিশ আধিকারিক, এক ডজনেরও বেশি পুলিশকর্মী এবং একাধিক সিভিক ভলান্টিয়ার। এছাড়া সিভিল ডিফেন্স কর্মীরাও দায়িত্ব পালন করছেন। গোটা এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে হ্যালোজেন আলো, যার ফলে পুরো এলাকা রাতভর আলোকিত থাকে।
 
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য গোয়েন্দা দপ্তর হোল্ডিং সেন্টারে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করবে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের পর বিএসএফ চাইলে তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নিতে পারবে। এরপর দুই দেশের প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পুশব্যাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
 
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে মানবিক কারণে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে সীমান্ত সুরক্ষা এবং অনুপ্রবেশ রোধের কার্যকারিতা নিয়ে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা নতুন নয়। ফলে নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
 
সব মিলিয়ে, মালদহের হোল্ডিং সেন্টার শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ নয়, বরং সীমান্ত, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা, এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একসঙ্গে সামনে এনে দিয়েছে। পুশব্যাকের অপেক্ষায় থাকা এই ‘বিদেশি’ অতিথিদের ঘিরে তাই এখন জেলাজুড়ে কৌতূহল ও আলোচনা তুঙ্গে।