শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
উৎসবের আসল সৌন্দর্য কি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে? নাকি তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের মিলন? কলকাতার মোমিনপুরের জন্মাষ্টমীর ইতিহাস যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে দেয়। প্রায় ছ’দশক ধরে একটি হিন্দু ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি পথ চলার যে ছবি তৈরি হয়েছিল, তা কলকাতার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই ছবিতে এসেছে নীরব পরিবর্তন। কোথাও কোনও বড় বিরোধের খবর নেই, নেই ধর্মীয় সংঘাত বা প্রকাশ্য মান-অভিমানের কাহিনি। তবু বদলে গিয়েছে অনুষ্ঠান পরিচালনার ছবি।
ভুকাইলাশ রোড ও হুসেন শাহ রোডের সংযোগস্থলের এই জন্মাষ্টমী উৎসব এ বার ৫৮তম বছরে পড়েছে। স্থানীয় ও প্রকাশিত সংবাদসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ছ’দশক আগে কিডারপুর সমাজ কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে এই আয়োজনের সূচনা হয়। এর সঙ্গে মুসলিম সমাজকর্মী মহম্মদ কাশিমের নামও উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম বাসিন্দাদের যৌথ অংশগ্রহণে উৎসবটি এগিয়ে চলেছিল।
২০১১ সালের পর উৎসবকে নতুন করে সক্রিয় করার ক্ষেত্রেও মুসলিম যুবকদের ভূমিকার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রাক্তন কমিটির সদস্য মহম্মদ আলমের দাবি, একসময় প্রায় ২০ সদস্যের কমিটিতে মুসলিম সদস্যের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। জন্মাষ্টমীর আয়োজন, প্রসাদ বিতরণ থেকে শুরু করে নানা ব্যবস্থাপনায় তাঁরা হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন।
এই জায়গাতেই মোমিনপুরের জন্মাষ্টমীর গল্প অন্য অনেক উৎসবের থেকে আলাদা। কারণ এখানে সম্প্রীতি ছিল কোনও বিশেষ দিনের স্লোগান নয়; ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। একই পাড়ার মানুষ হিসেবে একসঙ্গে উৎসব আয়োজন, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো—সবটাই চলেছে অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই।সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন বদলায়, বদলায় পাড়ার সামাজিক বিন্যাসও। উৎসবের পরিচালনাতেও আসে নতুন প্রজন্ম, নতুন ভাবনা, নতুন ব্যবস্থাপনা। ২০২৬ সালে এসে জন্মাষ্টমীর আয়োজক কমিটিতে আর মুসলিম সদস্যদের দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান আয়োজকদের বক্তব্য, এ বার অনুষ্ঠানটি হিন্দুদের পরিচালনাতেই হচ্ছে। তবে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবে আসতে পারেন—এমন কথাও বর্তমান আয়োজকদের তরফে বলা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর নেপথ্যে কোনও প্রকাশ্য ধর্মীয় বিরোধের ঘটনা সামনে আসেনি। অর্থাৎ যে সম্প্রীতির ছবি এতদিন মোমিনপুরের জন্মাষ্টমীকে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল, তা যেন কোনও একদিনে ভেঙে পড়েনি। বরং সময়ের অজান্তে, প্রজন্মের পরিবর্তনে কিংবা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের স্বাভাবিক বদলে অনুষ্ঠানটির চরিত্র অন্য রকম হয়ে উঠেছে।
তবু ইতিহাস মুছে যায় না। আজকের আয়োজনের চরিত্র বদলালেও মোমিনপুরের জন্মাষ্টমীর অতীত মনে করিয়ে দেয়—একটি ধর্মীয় উৎসবও কীভাবে একটি পাড়ার সামাজিক বন্ধনের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। যে উৎসবে একসময় ভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেছেন, সেই স্মৃতি আজও স্থানীয় মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।সময়ের স্রোতে হয়তো উৎসবের ব্যবস্থাপনা বদলেছে। কিন্তু মোমিনপুরের গল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি রয়ে গিয়েছে সেই দীর্ঘ কয়েক দশকের যৌথ পথচলায়। কারণ সম্প্রীতির ইতিহাস শুধু বড় বড় ঘটনার মধ্যে লেখা হয় না; কখনও তা লেখা থাকে একটি প্যান্ডেল তৈরির কাজে, প্রসাদ বিলির সারিতে, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোয়। মোমিনপুরের জন্মাষ্টমী সেই ইতিহাসেরই এক নীরব সাক্ষী।
২০২৬-এর পরিবর্তন তাই শুধুই বদলে যাওয়া একটি কমিটির গল্প নয়। এটি কলকাতার এক পাড়ার সামাজিক ইতিহাসের নতুন অধ্যায়—যেখানে পুরনো দিনের সম্প্রীতির স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল, আর ভবিষ্যৎ হয়তো আবার কোনও নতুন মিলনের গল্প লেখার অপেক্ষায়।