দেবকিশোর চক্রবর্তী
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনাহীন SIR (Summary Intensive Revision) প্রয়োগের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দিল্লির নির্বাচন কমিশনের অফিসে সরব হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ১০ সদস্যের সাংসদ–প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দলের লোকসভা ও রাজ্যসভার শীর্ষস্থানীয় সাংসদরা—বিশেষত সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও'ব্রায়েন এবং বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে কড়া ভাষায় বক্তব্য রাখা শতাব্দী রায়। প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শান্তনু সেন-সহ কয়েকজন সাংসদ।
তাঁদের অভিযোগ, কমিশন একতরফাভাবে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং বাংলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে পাঁচটি গুরুতর প্রশ্ন তোলেন তাঁরা, কিন্তু কোনও প্রশ্নেরই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন—এমনটাই দাবি প্রতিনিধি দলের।
প্রথম প্রশ্ন: কেন কেবল পশ্চিমবঙ্গে এই বিশেষ SIR?
প্রতিনিধি দলের প্রশ্ন—যদি ভুয়ো ভোটার চিহ্নিত করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে দেশের অন্যান্য রাজ্য নয়, কেন কেবল পশ্চিমবঙ্গেই এই প্রক্রিয়া? বহু রাজ্যে একই সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় কমিশন বাংলাকেই লক্ষ্য করছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এই প্রশ্নে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে অভিযোগ।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: সন্দেহভাজন ভোটারদের ভোটে গঠিত সরকার কি তাহলে অবৈধ?
সাংসদরা জানান, আজ যাঁদের ভুয়ো বা সন্দেহভাজন ভোটার বলা হচ্ছে, তাঁদের ভোটেই অতীতে সরকার গঠিত হয়েছে। যদি সেই ভোটারদের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে, তবে কি সেই সরকারও অবৈধ? কমিশন এই প্রশ্নেও নীরব থাকে।
তৃতীয় প্রশ্ন: SIR–এর চাপে সাধারণ মানুষ ও BLO–দের মৃত্যু—দায় নেবে কে?
তাঁদের অভিযোগ, পরিকল্পনাহীন SIR-এর চাপে বহু সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন, এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের ফলে কয়েকজন BLO-এর মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় কি নির্বাচন কমিশন নেবে? কমিশন এ বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করেনি।
চতুর্থ প্রশ্ন: বাংলা সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীদের দিয়ে ডেটা এন্ট্রি করাতে আপত্তি কেন?
প্রতিনিধি দলের দাবি, বাংলা সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি তথ্যভান্ডারের কাজ সামলাচ্ছেন। তাঁরা দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও কমিশন তাঁদের কাজে লাগাতে অস্বীকার করছে—ফলে BLO–দের ওপর অমানবিক চাপ বাড়ছে। কমিশন এই প্রশ্নও এড়িয়ে যায়।
পঞ্চম প্রশ্ন: বিজেপি নেতাদের ‘১ কোটি নাম বাদ যাবে’ মন্তব্য—তথ্য পেলেন কীভাবে?
সাংসদদের অভিযোগ, বিজেপির একাধিক নেতা প্রকাশ্যে বলছেন যে বাংলায় নাকি ১ কোটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। প্রতিনিধি দলের প্রশ্ন—এই তথ্য তাঁদের কাছে আগে থেকে কীভাবে পৌঁছালো? তাহলে কি কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে? কমিশনের নীরবতা এই সন্দেহকেই বাড়ায় বলেই অভিযোগ।
প্রতিবাদ শেষে শতাব্দী রায় তীব্র ভাষায় বলেন—নির্বাচন কমিশন স্পষ্টতই পক্ষপাত দেখাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, “কমিশন বিজেপিকে সুবিধা দিতেই সব করছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, BLO–দের উপর অমানবিক চাপ, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও তাঁদের বিবেক নড়াতে পারছে না।”
প্রতিনিধি দলের অভিযোগ, SIR প্রয়োগে স্বচ্ছতা নেই, পরিকল্পনা নেই, সমন্বয় নেই। বরং আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর জোর করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে। তাদের দাবি—কমিশনের আচরণ গণতন্ত্রে মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।
এখন নজর থাকবে—এই পাঁচ দফা অভিযোগের মুখে নির্বাচন কমিশন কোনও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয় কি না। তাঁদের বক্তব্য, কমিশন যদি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে আসন্ন ভোট প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো—উভয়ই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।