দেবকিশোর চক্রবর্তী
রাজ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম এখন ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়েছে। এই নামগুলি খতিয়ে দেখছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট-নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। ইতিমধ্যে আংশিক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে আরও তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। তবে এই ৬০ লক্ষের মধ্যে যাঁদের নাম শেষ পর্যন্ত বাদ পড়বে, তাঁদের জন্য আবেদন জানানোর বিকল্প পথও খোলা রাখা হয়েছে আদালতের নির্দেশে।
এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়নি। আমাদের লড়াইয়ের কারণেই দরজাটা এখনও খোলা রয়েছে।’’সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী কলকাতা হাইকোর্টর প্রধান বিচারপতিকে একটি বিশেষ বিচারসভা গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিচারসভায় নাম বাদ পড়া ব্যক্তিরা নিজেদের নথিপত্র পেশ করে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়। বুধবার সেই নির্দেশনামা প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিকাল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি নিজের এজলাসে অন্য মামলার শুনানিতে ব্যস্ত থাকায় বিচারসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে কিছুটা সময় লাগছে। আদালত সূত্রে মনে করা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দু’এক দিন সময় লাগতে পারে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও তৎপরতা বেড়েছে। শাসকদল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সূত্রে জানা গিয়েছে,‘বিবেচনাধীন’তালিকায় থাকা ৬০ লক্ষ নামের মধ্যে অন্তত ৪০ লক্ষ নাম শেষ পর্যন্ত মূল ভোটার তালিকায় উঠে আসতে পারে বলে তাদের অনুমান। কয়েক লক্ষ নাম যথাযথ কারণেই বাদ পড়তে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। তবে দলের একাংশের আশঙ্কা, এমন অনেক ভোটারও থাকতে পারেন যাঁদের কাছে বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নাম প্রাথমিক তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে।
এই কারণেই বিচারসভার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে তৃণমূল নেতৃত্ব। কারণ, এই বিচারসভার কাজে ভারতের নির্বাচন কমিশনের সরাসরি কোনও ভূমিকা থাকবে না। ফলে বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিচারসভার মাধ্যমে নিজেদের দাবি পেশ করার সুযোগ পাবেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা ভারতীয় রাজনৈতিক কর্ম কমিটির সহায়তায় তৃণমূলের হাতে বুথভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বাদ পড়া ভোটারদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের একটি জেলার তৃণমূল সভাপতির দাবি, ‘‘কোন বুথে কার নাম বাদ পড়তে পারে এবং তাঁদের কাছে কী ধরনের নথি রয়েছে, সেই তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ করা সম্ভব হবে।’
’
এদিকে সন্দেহভাজন ভোটারের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার প্রসঙ্গ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন,অসমের মতো পরিস্থিতি কি ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হতে পারে? অসমে নাগরিকপঞ্জি সংক্রান্ত বিতর্কের সময় আটক শিবিরের বিষয়টি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল।
তবে রাজ্যের শাসকদল এই তুলনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ মেনেই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হবে এবং যাঁদের নাম বাদ পড়বে তাঁদের জন্য বিচারসভার দরজা খোলা থাকবে।ফলে এখন রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের নজর রয়েছে দুটি বিষয়ের দিকে—চূড়ান্ত তালিকার পরবর্তী ধাপের প্রকাশ এবং বিচারসভা গঠনের প্রক্রিয়া। কারণ, ‘বিবেচনাধীন’ এই ৬০ লক্ষ নামের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করতে পারে রাজ্যের ভোটার তালিকার একটি বড় অংশের ভাগ্য।