ভোপাল জমিয়ত সম্মেলনে মাদানী: ভারত মুসলমানদের চিরন্তন মাতৃভূমি, কেউ এখানে পরবাসী নয়

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 7 Months ago
ভোপালে অনুষ্ঠিত জমিয়ত উলামা-এ-হিন্দের গভর্নিং বডি কাউন্সিলের অধিবেশনে সংস্থার প্রধান ও সাবেক সাংসদ মৌলানা মাহমুদ মাদানী
ভোপালে অনুষ্ঠিত জমিয়ত উলামা-এ-হিন্দের গভর্নিং বডি কাউন্সিলের অধিবেশনে সংস্থার প্রধান ও সাবেক সাংসদ মৌলানা মাহমুদ মাদানী
 
আওয়াজ দ্যা ভয়েস, ভোপাল

ভোপালে অনুষ্ঠিত জমিয়ত উলামা-এ-হিন্দের গভর্নিং বডি কাউন্সিলের অধিবেশনে সংস্থার প্রধান ও সাবেক সাংসদ মৌলানা মাহমুদ মাদানী একটি গুরুত্বপূর্ণ, গভীর ও দিকনির্দেশক বক্তব্য রাখেন। তিনি মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেন যে আচার-আচরণে এমন স্বভাব গড়ে তুলতে হবে যা মানুষের দিকে আহ্বান করে, শত্রুতা বা সংঘর্ষের দিকে নয়। তাঁর মতে, ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে আদব, সবর, সহমর্মিতা ও মানবতার বার্তায়, এবং এই মূল্যবোধগুলো সমাজের সামনে জীবন্তভাবে তুলে ধরা আজ সবচেয়ে জরুরি। মুসলমানেরা অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, সুন্দর সম্পর্ক গড়বে, পাশাপাশি ইসলামের সত্য ও সার্বজনীন শিক্ষার সঙ্গে সমাজকে পরিচিত করানোর দায়িত্বও পালন করবে।
 
মৌলানা মাদানী বলেন যে যেকোনো কঠিন সময় ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে সবর, বুদ্ধিমত্তা ও ঈমানের সঙ্গে। তিনি কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের উদাহরণ দেন, যেমন সূরা আল-আহকাফ আয়াত ৩৫-এ আল্লাহর নির্দেশ: “ধৈর্য ধরো যেমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নবীরা ধৈর্য ধরেছিলেন।” সূরা আল-আহযাব আয়াত ৪৮-এ বলা হয়েছে: “তাদের কষ্টের পরোয়া করো না এবং আল্লাহর ওপরে ভরসা করো।” সূরা আন-নাহলের নির্দেশ: “তোমার প্রভুর পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম নসিহতের মাধ্যমে।” আবার সূরা ফুসসিলাত আয়াত ৩৪-এ বলা হয়েছে: “মন্দের জবাব দাও উৎকৃষ্ট সৎকর্ম দিয়ে।”
 
তিনি বলেন, মুসলমানদের খাজা গরীব নবাজ হজরত মৈনুদ্দিন চিশতি আজমেরীর চরিত্র ও মিশন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত, কঠিন পরিস্থিতিতেও প্রেম, সেবা, সহমর্মিতা ও মানবতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা দাওয়াত-ই-ইসলামের প্রকৃত পথ; সংঘর্ষ নয়।
 
ভোপালে অনুষ্ঠিত জমিয়ত উলামা-এ-হিন্দের গভর্নিং বডি কাউন্সিলের অধিবেশনে সংস্থার প্রধান ও সাবেক সাংসদ মৌলানা মাহমুদ মাদানী
 
তিনি বলেন, ভারতীয় মুসলমানদের সঙ্গে এই মাটির সম্পর্ক নতুন নয়, বরং অত্যন্ত প্রাচীন। বর্ণনামতে প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হজরত আদম এই পৃথিবীতেই আগমন করেছিলেন। ইসলাম সার্বজনীন বার্তা, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। তাই ভারত কখনো মুসলমানদের জন্য পরদেশ ছিল না এবং হবে না।
 
তিনি জমিয়তের প্রবীণ সদস্যদের কৃতিত্ব উল্লেখ করে বলেন যে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও দাঙ্গার সময়ও হজরত মৌলানা হুসেন আহমদ মাদানী দেশ ছাড়েননি এবং বলেছিলেন, “ভারতে থেকে যে সেবা আমি করতে পারি, তা মদিনাতুল মুনাওয়ারাতেও সম্ভব নয়।” একই সময় মৌলানা যাকারিয়া বলেছিলেন, “আমি ভারতে মৃত্যুবরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” এই মনোভাব প্রমাণ করে যে ভারতীয় মুসলমানেরা দেশকে বরাবরই আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে।
 
নিজ বক্তব্যে মৌলানা মাদানী ‘জিহাদ’ শব্দকে ঘিরে ছড়ানো বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারেরও কঠোর নিন্দা করেন। তিনি বলেন, এই পবিত্র শব্দ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের কারণে সন্ত্রাসবাদের প্রতিশব্দ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জিহাদের প্রকৃত অর্থ হলো কল্যাণ, সংস্কার, ন্যায়বিচার এবং অত্যাচারের অবসানের জন্য সংগ্রাম। অথচ আজ ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘থুঁক জিহাদ’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে মুসলমানদের আঘাত করা হচ্ছে, এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহু দায়িত্বশীল মানুষও এই ভাষা ব্যবহার করছেন।
 
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে জিহাদ কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা অনুমতিহীন লড়াই নয়; এর সিদ্ধান্ত দিতে পারে শুধুমাত্র এমন সরকার যা ইসলামী শরিয়তের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যেহেতু ভারত একটি সংবিধানভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তাই এখানে জিহাদের নামে কোনো আলোচনা বা কর্মকাণ্ডের প্রশ্নই ওঠে না। মুসলমানেরা দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি বিশ্বস্ত, এবং নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
 
তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো জাতিই সমস্যাহীন নয়। সমস্যাই জীবন্ত জাতির পরিচয়, মৃত জাতি সমস্যার সামনে হার মানে, সংগ্রাম করে না। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ বলেন: “আমি তোমাদের পরীক্ষা করব, ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, প্রাণহানি এবং ফসলের ক্ষতিতে, আর ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।” সুতরাং সমস্যার আগমন দুর্বলতা নয়, তা মানব ও জাতির পরীক্ষা।
 
বক্তৃতার শেষে মৌলানা মাহমুদ মাদানী বিশেষ করে সন্তানদের শিক্ষা ও নৈতিক লালন-পালনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সন্তান আল্লাহর নিয়ামতও এবং পরীক্ষা ও, শুধু স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাদের চরিত্র, ভাষা, অভ্যাস, সততা, সময়ের মূল্যবোধ ও ইবাদতের প্রতি যত্নশীলতা সবকিছুর তত্ত্বাবধান বাবা-মায়ের দায়িত্ব। শুধু জ্ঞান দিলে হবে না, নৈতিকতা, আচরণ, সভ্যতা ও দ্বীনী শিক্ষার ভিত্তি গড়তে হবে।
 
তিনি বিশেষভাবে বলেন, শিশুর আবেগিক বিকাশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও সংলাপ থেকে বঞ্চিত হলে ক্ষতি অপরিমেয় হয়। ভালোবাসা, সম্মান, সহনশীলতা ও শান্তিতে ভরা পারিবারিক পরিবেশই শিশুর ভবিষ্যতের ভিত্তি, যা তাকে সমাজের ওষুধ বানায়, বোঝা নয়।


শেহতীয়া খবৰ