একদা ফরাসি শাসনাধীন চন্দননগরের বর্তমান মেয়র রাম চক্রবর্তী
দেবকিশোর চক্রবর্তী / চন্দননগর
ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি, এই সত্যকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করেছিল বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে চন্দননগর-এর প্রবর্ত্তক সঙ্ঘে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের প্রেক্ষাপট এবং এর বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেন।
অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ বহু ভাষা শহীদের রক্তে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আত্মবলিদান কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের সংগ্রাম নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের লড়াই হিসেবেও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
তিনি উল্লেখ করেন, ভাষা আন্দোলনের এই ইতিহাস আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চলে। প্রবাসী বাঙালি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির উদ্যোগে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো-র কাছে দাবি জানানো হয়। অবশেষে ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে তা পালিত হচ্ছে।
অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে বলেন, “এই স্বীকৃতি শুধু একটি দেশের অর্জন নয়, বরং বিশ্বের ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।” তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বায়নের যুগে বহু ভাষা বিলুপ্তির মুখে, তাই মাতৃভাষার সংরক্ষণ আজ আরও জরুরি।
এদিনের অনুষ্ঠানে সঙ্ঘের সম্পাদক প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চন্দননগরের মেয়র মাননীয় রাম চক্রবর্তী, যিনি ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।
মেয়র রাম চক্রবর্তী তাঁর বক্তৃতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই দিনেই বিপ্লবী চিন্তাবিদ অরবিন্দ ঘোষ-এর চন্দননগরে আগমনের ঘটনা ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর এই আগমন স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত হন যে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সংস্কৃতি, চিন্তাভাবনা এবং একটি জাতির অস্তিত্বের প্রতীক। ভাষার উপর আঘাত মানে সেই জাতির পরিচয়ের উপর আঘাত। তাই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের মানবাধিকারের লড়াই সম্পর্কেও শিক্ষা দেয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির বিকাশ মাতৃভাষার প্রসারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি, গবেষণা এবং অনুবাদের প্রসার ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানের শেষে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সকলেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তাই শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি ভাষাগত অধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং মানবিক চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক।