গান্ধীর ‘সহোদর’ ইমাম বাওয়াজির: সম্প্রীতির এক বিস্মৃত অধ্যায়

Story by  PTI | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 14 h ago
গান্ধীর ‘সহোদর’ ইমাম বাওয়াজির: সম্প্রীতির এক বিস্মৃত অধ্যায়
গান্ধীর ‘সহোদর’ ইমাম বাওয়াজির: সম্প্রীতির এক বিস্মৃত অধ্যায়
আহমেদাবাদ:

গান্ধীজয়ন্তীর প্রাক্কালে মহাত্মা গান্ধীর জীবনের এক অপেক্ষাকৃত অজানা অধ্যায় নতুন করে সামনে এসেছে—আবদুল কাদির বাওয়াজির, যিনি ‘ইমাম বাওয়াজির’ নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁর সঙ্গে গান্ধীর গভীর বন্ধুত্ব এবং সম্প্রীতির সম্পর্ক।

ইমাম বাওয়াজিরের সঙ্গে গান্ধীর সম্পর্ক ছিল এতটাই ঘনিষ্ঠ যে গান্ধী তাঁকে ‘সহোদর’ বলে মনে করতেন। ইতিহাসবিদ রিজওয়ান কাদরির কথায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীর আন্দোলনের সময় তাঁদের পরিচয়। পেশায় মৌলবি না হলেও বাওয়াজির একটি মসজিদে নিয়মিত প্রার্থনা পরিচালনা করতেন। সেখান থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘ইমাম’ শব্দটি যুক্ত হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধী ভারতে ফিরে আসার সময় বাওয়াজির আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। সেই মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে কাদরি জানান, গান্ধী তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “আমরা দু’জনই সহোদর—একই মায়ের সন্তান।”

পরে গান্ধী আমদাবাদে বসতি স্থাপন করলে বাওয়াজিরও সেখানে চলে আসেন। গান্ধী সাবরমতী আশ্রমে গেলে তিনিও আশ্রমে থাকতেন। আজও আমদাবাদের আশ্রমের কাছে তাঁর সঙ্গে যুক্ত ‘ইমাম মঞ্জিল’ নামে একটি বাড়ি রয়েছে।

গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন বাওয়াজির। ১৯৩০ সালে ডান্ডি অভিযান শুরু হলে ধরসানায় সত্যাগ্রহের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি, জানান ইতিহাসবিদ কাদরি।

শুধু বাওয়াজির নয়, তাঁর পরিবারের প্রতিও গান্ধীর ছিল বিশেষ স্নেহ। বাওয়াজিরের দুই মেয়ে ফাতিমা ও আমিনার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র গান্ধীর নামে প্রকাশ করা হয়েছিল।

কাদরির বর্ণনা অনুযায়ী, একবার সরদার বল্লভভাই প্যাটেল গান্ধীর সঙ্গে কথোপকথনের সময় জানান যে বাওয়াজিরের মেয়ে আমিনা অবিবাহিত। প্যাটেল গান্ধীবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী গোলাম রাসুলের সঙ্গে আমিনার বিয়ের প্রস্তাব দেন। গান্ধীও তাতে সম্মতি জানান।

পরবর্তীতে হৃদয় কুঞ্জে গোলাম রাসুল ও আমিনা বিবির নিকাহ অনুষ্ঠিত হয়। সেই বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রেও গান্ধীর নাম ছিল।

কাদরির মতে, গান্ধীর নিজের সন্তানদের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রও তাঁর নামে প্রকাশিত হয়নি, অথচ বাওয়াজিরের দুই মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে গান্ধীর নাম ছিল—যা তাঁদের সম্পর্কের গভীরতার একটি বিরল নিদর্শন।

‘গান্ধীর ভাই’, প্যাটেলের কাছে ‘বড়’

বাওয়াজিরের সঙ্গে সরদার প্যাটেলেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করে একটি শোকসভা আয়োজনের উদ্যোগ নেন প্যাটেল। আমদাবাদের মানেক চক-এ তাঁর সভাপতিত্বে সেই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাওয়াজির সম্পর্কে প্যাটেলের একটি মন্তব্য আজও বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। কাদরির উদ্ধৃতি অনুযায়ী, প্যাটেল তাঁকে বলেছিলেন, “তিনি ছিলেন গান্ধীর ভাই ও সঙ্গী, যিনি জীবনের শেষ মুহূর্তেও গান্ধীকে স্মরণ করতেন।”

প্যাটেল আরও বলেছিলেন, সংকটের সময়ে তাঁর কাঁধে হঠাৎ যে হাত এসে ভর করত, সেটি ছিল ইমাম বাওয়াজিরের হাত।

তাঁর ভাষায়, “তিনি গান্ধীর সহোদর ছিলেন, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন বড় ভাই।”

আজও গান্ধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ইমাম বাওয়াজিরের স্মৃতি ধরে রেখেছেন। ডান্ডি অভিযানে গান্ধীর সঙ্গে অংশ নেওয়া ধীমন্ত বাদিয়ার জানান, প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর অনেকে আমদাবাদের বাগ-এ-ফিরদৌস কবরস্থানে মিলিত হয়ে গান্ধীর এই বন্ধুকে স্মরণ করেন।

ইমাম বাওয়াজিরের গল্প তাই শুধু গান্ধীর জীবনের একটি বিস্মৃত অধ্যায় নয়। তাঁর সঙ্গে গান্ধী ও প্যাটেলের সম্পর্ক দেখায়, স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়েও সম্প্রীতি, বিশ্বাস ও মানবিক বন্ধন কীভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের সীমানা ছাপিয়ে উঠেছিল।