মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ৪৪ বছরের গৃহবধূ মোস্তারি বানু, নামটি ২০২৫ সালের শেষদিকে জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে আসে। মামলার শিরোনাম ছিল ‘Mostari Banu vs. The Election Commission of India’, যা ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আইনি বিতর্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। Election Commission of India (ইসিআই) পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়া শুরু করে। অভিযোগ ওঠে, এই প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। পাশাপাশি ভোটার যাচাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট নথি, বিশেষ করে পাসপোর্ট সাইজের ছবি বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ বিতর্কের জন্ম দেয়।
এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রথম আইনি পদক্ষেপ নেন মোস্তারি বানু। একজন সাধারণ মুসলিম গৃহবধূ হিসেবে তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্ত অনেককেই বিস্মিত করে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ যখন বিষয়টি নিয়ে নীরব, তখন তিনি নীরবে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, এই নথি-নির্ভর যাচাই প্রক্রিয়া প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের ভোটাধিকারকে বিপন্ন করতে পারে।
পরবর্তীতে বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গড়ায়। Supreme Court of India-তে মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাত্রা পায়। ৪ ফেব্রুয়ারি শুনানিতে স্বয়ং Mamata Banerjee উপস্থিত হয়ে ইসিআই-এর পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন। তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। কিন্তু এই রাজনৈতিক নাটকের আড়ালে থেকে যায় মোস্তারি বানুর নীরব, দৃঢ় লড়াইয়ের গল্প।
মোস্তারি বানুর পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। তবে এই মামলার আসল তাৎপর্য ছিল, এক সাধারণ নাগরিকের উদ্যোগেই একটি বৃহৎ সাংবিধানিক প্রশ্নের সূচনা। তাঁর আবেদনই প্রথমবারের মতো ইসিআই-এর বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়াকে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
ভগবানগোলার এক সাধারণ মুসলিম মহিলা, যিনি হয়তো কখনও ভাবেননি তাঁর নাম জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হবে, তিনিই হয়ে ওঠেন গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতীক। তাঁর লড়াই কেবল একটি মামলার সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার এক বিরল দৃষ্টান্ত।
মোস্তারি বানুর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রে পরিবর্তনের সূচনা প্রায়শই বড় মঞ্চ থেকে নয়, বরং কোনও এক নীরব ঘরের কোণ থেকে হয়। তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে, অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে পরিচয় বা অবস্থান নয়, প্রয়োজন কেবল দৃঢ় বিশ্বাস ও সাহস।