দেবকিশোর চক্রবর্তী, কলকাতা
দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের অনেকেই ভাষাগত বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হতে হন। এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভিন রাজ্যে হেনস্থার শিকার হওয়া বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ঘোষণা করলেন নতুন এক প্রকল্প।
দিন কয়েক আগে পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেল একটি নতুন প্রকল্প, ‘শ্রমশ্রী’। নবান্নে চোদ্দ তলায় আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন,' ভয় পাবেন না। আমি আছি আপনাদের পাশে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকেরা ভাষাগত বৈষম্য ও নানান রকম হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। অনেককেই শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার অপরাধে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করা হচ্ছে, কোথাও গ্রেফতার করা হচ্ছে, কোথাও থানা-পুলিশের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।' এর ফলে প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন।
এই প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার ‘শ্রমশ্রী’ নামে একটি নতুন প্রকল্প চালু করছে। এর মূল লক্ষ্যই হল, বাংলার বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা যদি অত্যাচারিত হয়ে বা অসহায় অবস্থায় ফিরে আসেন, তাঁদের পুনর্বাসন ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকেরা, যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মসংস্থানের খোঁজে গিয়েছিলেন এবং বর্তমানে নানা কারণে অত্যাচারিত বা বঞ্চিত হয়ে ফিরতে চাইছেন, তাঁরা পাবেন ভাতা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা।
তিনি অভিযোগ করেন, ডবল-ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের নিয়মিত হেনস্তার মুখে পড়তে হচ্ছে, প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার এর শিকার। এঁদের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক শ্রমিকই মূলত বাংলার মানুষ। পাশাপাশি অন্যান্য রাজ্য থেকেও দেড় কোটির বেশি শ্রমিক বাংলায় বসবাস করছেন। ‘বাংলা ভাষায় কথা বলাটা যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বাংলায় দেশের সব প্রদেশের মানুষ সম্মানের সঙ্গে বসবাস করেন। এভাবে চলতে পারে না’, মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থানসহ নানা রাজ্যে আটকে পড়া প্রায় ২,৭৩০ পরিবারকে আদালতের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদি প্রত্যেক পরিবারে গড়ে চার-পাঁচজন করে ধরা হয়, তবে ইতিমধ্যেই ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আরও অনেকে নিজে থেকেই ফিরছেন এবং ‘শ্রমশ্রী’ পোর্টালে আবেদন করছেন।
তিনি জানান পরিযায়ী শ্রমিকরা ‘শ্রমশ্রী’তে আলাদা করে নাম নথিভুক্ত করলে সরকারি সাহায্য পাওয়া যাবে। একবছর কাজের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে শ্রমিক পরিবারের জন্য ৫০০০ টাকা করে দেবে রাজ্য সরকার। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যসাথী, খাদ্যসাথী প্রকল্পের সুবিধা এবং ‘উৎকর্ষ বাংলা’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে তাঁদের। এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণী এমসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযোগ করেন, মানসিক স্বাস্থ্য সার্ভের নামে প্রতিষ্ঠানটি পরোক্ষে এনআরসি কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেন, ‘স্টেট গভর্নমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো সংস্থা যদি বাড়ি বাড়ি সার্ভে করতে আসে, তাহলে কোনো তথ্য দেবেন না। আমাদের জানানো ছাড়া কোনো সার্ভে হবে না’। সবশেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রকল্প মানবিকতার খাতিরে। অসহায়, অবহেলিত ও অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়াতেই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা যেন নিজের রাজ্যে ফিরে এসে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য’।