এক ইনজেকশনের স্বপ্ন: দেবলীনা সরকারের নীরব চিকিৎসা-বিপ্লব

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 17 d ago
দেবলীনা সরকার
দেবলীনা সরকার
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

কলকাতার রাস্তায় তখন ভোরের আলো ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একা একা হেঁটে চলেছে একটি মেয়ে। মাইলের পর মাইল পথ পেরিয়ে সে শুধু স্কুলে যাচ্ছে না, হেঁটে চলেছে নিজের ভবিষ্যতের দিকেও। সেই মেয়েটির নাম দেবলীনা সরকার। আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পৃথিবীর অন্যতম সেরা গবেষণাগার, এমআইটি-তে (MIT), যেখানে তাঁর কাজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে।
 
দেবলিনার গবেষণার নাম ‘Circulatronics’, শুনতে ভবিষ্যতের গল্পের মতো লাগলেও, এটি বাস্তব বিজ্ঞানের এক সাহসী উদ্ভাবন। অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক চিপের একটি ঝাঁক, যা রক্তপ্রবাহের সঙ্গে শরীরের ভেতর ভ্রমণ করতে পারে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এই চিপগুলি রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে সরাসরি আক্রান্ত স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম।
এই চিপগুলিকে বাইরে থেকে লেজারের সাহায্যে সক্রিয় করা হলে, তারা নির্দিষ্ট নিউরনকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উদ্দীপিত করে। ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েক দিনের মধ্যেই চিপগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছে এবং পিনের মাথার থেকেও ছোট এলাকায় স্নায়বিক ক্রিয়া ঘটিয়েছে, তাও আশপাশের সুস্থ কোষের কোনও ক্ষতি না করেই।
 
বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রেন ইমপ্ল্যান্ট মানেই বড় অস্ত্রোপচার, দীর্ঘ সুস্থ হওয়ার সময় এবং আকাশছোঁয়া খরচ। বহু মানুষের কাছেই সেই চিকিৎসা অধরাই থেকে যায়। দেবলিনার ভাবনায় সেই জায়গাটাতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, চিকিৎসা কি এতটাই দূরের হওয়া উচিত? তাঁর ‘Circulatronics’ হয়তো একদিন সেই ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের বদলে দেবে একটি সাধারণ ইনজেকশন, যা উন্নত চিকিৎসাকে পৌঁছে দেবে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে।
 
এই প্রযুক্তির স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। ভবিষ্যতে এটি ক্যান্সার চিকিৎসা, কিংবা শরীরের ভেতরে ক্ষুদ্র পেসমেকার পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ, একটিমাত্র ধারণা খুলে দিতে পারে বহু চিকিৎসার দরজা।
 
দেবলীনা সরকার
 
তবে দেবলীনার এই লড়াই শুধুই গবেষণার সাফল্যের গল্প নয়, এটি এক গভীর মানবিক যাত্রাও। নানা রোগীর পাঠানো বার্তা, তাঁদের বাঁচার আকুতি তাঁকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, এই কাজ কেবল পরীক্ষাগারের জন্য নয়, মানুষের জীবনের জন্য। সেই বিশ্বাসই তাঁকে নিরলসভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
 
সম্প্রতি নিজের ‘এক্স’ (X) হ্যান্ডেলে দেবলীনা লিখেছেন, ‘Bochhorer Best Award’ পাওয়ার আনন্দ তাঁর কাছে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল, কারণ সেই পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে তাঁর মা–বাবা দু’জনেই উপস্থিত থাকতে পেরেছিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ছোটবেলায় বাবাকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে কাজ করতে দেখেই তাঁর বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ছাড়া ওয়াশিং মেশিন তৈরি করা, অত্যন্ত কার্যকর পুলি সিস্টেম, এইসব উদ্ভাবন তাঁকে শিখিয়েছিল, চিন্তা করলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আর তাঁর মা তাঁকে দিয়েছেন স্বপ্ন দেখার সাহস ও তা বাস্তবায়নের বিশ্বাস।
 
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীর সংখ্যা কম কেন, এই প্রশ্নের উত্তরে দেবলিনা স্পষ্টভাবেই বলেন, যদি প্রতিটি মেয়ের বাবা–মা তাঁর মতো সমর্থক হতেন, যদি কন্যাসন্তানকে পিছিয়ে না রেখে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিতেন, তাহলে নারীরা সব ক্ষেত্রেই বাধা ভেঙে এগিয়ে যেত।
 
"বছরের বেস্ট আওয়ার্ড" হাতে নিয়ে দেবলীনার তাঁর মা বাবার সঙ্গে একটি ছবি
 
আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মানবদেহে এই প্রযুক্তির পরীক্ষা শুরু করার আশায় রয়েছেন দেবলীনা। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লেখা হবে, যেখানে বড় কাটাছেঁড়ার বদলে থাকবে একফোঁটা ইনজেকশন।
 
গ্রামীণ বাংলার প্রান্তিক বাস্তবতা থেকে এমআইটি-র অত্যাধুনিক গবেষণাগার, দেবলিনা সরকারের এই পথচলা প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি বড় হয় আর পাশে থাকে বিশ্বাসী মানুষ, তবে একজন মেয়েও নীরবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে। কখনও কখনও সেই পরিবর্তন আসে বজ্রনিনাদে নয়, আসে নিঃশব্দে, রক্তপ্রবাহের সঙ্গে ভেসে চলা অদৃশ্য এক ঝাঁক চিপের মধ্য দিয়ে।