কাশ্মীর উপত্যকায় তরুণদের মানসিক সংকট: নীরব বিপদের মুখে একটি প্রজন্ম

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 d ago
প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জাসিন্দা মীর
প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জাসিন্দা মীর
 
ওনিকা মহেশ্বরী / নয়াদিল্লি

কাশ্মীর উপত্যকায় এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর সংকট ধীরে ধীরে শিকড় গেড়ে বসছে, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য। ডিপ্রেশন ও উদ্বেগের মতো সমস্যাগুলি আজ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বিস্তৃত সামাজিক বাস্তবতা। বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনধারা এবং সামাজিক মাধ্যমের লাগামছাড়া প্রভাব মিলিয়ে তরুণদের মন ক্রমেই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। অবিরাম স্ক্রিনে ডুবে থাকা, নেতিবাচক কনটেন্টের স্রোত এবং মানসিক বিশ্রামের অভাব এই প্রজন্মকে এমন এক চাপের মধ্যে ফেলছে, যা কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, সমাজের জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা।

কাশ্মীর উপত্যকায় মানসিক স্বাস্থ্যের এই সংকট এখন আর শুধু ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি গুরুতর সামাজিক ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপত্যকার তরুণদের মধ্যে ডিপ্রেশন, অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা (ওভারথিঙ্কিং) এবং উদ্বেগজনিত সমস্যার ঘটনা দ্রুত বেড়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই বাড়তে থাকা মানসিক চাপ তরুণদের পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক আচরণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা একে একটি “নীরব সংকট” হিসেবে দেখছেন, যার প্রতি সময়মতো নজর না দিলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
 

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জাসিন্দা মীরের মতে, ডিপ্রেশনকে এখনও সমাজে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না, অথচ এটি মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে সাধারণ কিন্তু বিপজ্জনক সমস্যাগুলোর একটি। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্ণ থাকে, কোনো কাজে আগ্রহ হারায়, ভবিষ্যৎকে অন্ধকার মনে হয় এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াও বন্ধ করে দেয়, যার ফলে ধীরে ধীরে এই মানসিক অসুস্থতা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
 
কাশ্মীরে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম আর কেবল যোগাযোগের একটি মাধ্যম নয়, এটি যেন এক ধরনের মানসিক দূষণে পরিণত হচ্ছে। স্মার্টফোনের পর্দায় অবিরাম ভেসে আসা নেতিবাচক খবর, সহিংস ভিডিও এবং কৃত্রিমভাবে সাজানো সুখী জীবনের ছবি তরুণদের মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সুযোগই দেয় না। এর ফলে এক ধরনের ডিজিটাল চাপ তৈরি হয়, যেখানে অজান্তেই মানুষ নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে এবং নিজের জীবনকে অসম্পূর্ণ ও ব্যর্থ বলে ভাবতে থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক মাধ্যমের মূল সমস্যা সেখানে কী দেখানো হচ্ছে তা নয়, বরং তরুণরা কোনো সীমা ছাড়াই সেগুলো ক্রমাগত গ্রহণ করছে, এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
 
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, দূষিত বাতাস যেমন ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে, তেমনই নেতিবাচক ডিজিটাল কনটেন্ট মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে তোলে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মস্তিষ্ক সবসময় ‘অ্যালার্ট মোড’-এ থাকে, যার ফলে অস্থিরতা বাড়ে এবং স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। অনেক তরুণ গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না এবং পরের দিন মানসিক ক্লান্তি নিয়ে শুরু হয়। এই ক্লান্তিই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ ও ডিপ্রেশনের রূপ নেয়। মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে না আনলে এই ডিজিটাল আসক্তি তরুণদের মানসিক ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে দেবে।
 
কাশ্মীরে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। শিক্ষিত তরুণরা বছরের পর বছর চাকরির সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, যার ফলে তাদের মধ্যে চাপ, হতাশা ও আত্মগ্লানির অনুভূতি জন্ম নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা একে অপরকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যেখানে কর্মসংস্থানের অভাব থাকে, সেখানে ডিপ্রেশন বেড়ে যায়; আবার মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল হলে ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
 
সামাজিক মাধ্যম কাশ্মীরে বাড়তে থাকা ডিপ্রেশনের একটি বড় কারণ হয়ে উঠছে। অবিরাম নেতিবাচক খবর, সহিংসতার ভিডিও, ব্যক্তিগত তুলনা এবং প্রদর্শনমূলক জীবনধারা তরুণদের মস্তিষ্কের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক মাধ্যম মস্তিষ্কের জন্য ঠিক তেমনই, যেমন শরীরের জন্য খাবার। যদি মস্তিষ্ককে সবসময় নেতিবাচক ও ভয় সৃষ্টিকারী কনটেন্ট দেওয়া হয়, তবে তার প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়বেই। অনেক তরুণ কোনো বিরতি ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, যার ফলে উদ্বেগ, ঘুমের অভাব ও ডিপ্রেশনের সমস্যা বেড়ে যায়।
 
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সামাজিক সমস্যা হলো, পুরুষদের নীরবতা। সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত ধারণা রয়েছে যে পুরুষকে সবসময় শক্ত হতে হবে এবং আবেগ প্রকাশ করা দুর্বলতার লক্ষণ। এই মানসিকতার কারণে বহু তরুণ নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই চেপে রাখে এবং সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করে। অন্যদিকে, নারীরা তুলনামূলকভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন বলে তাদের মধ্যে ডিপ্রেশনের ঘটনা বেশি নথিভুক্ত হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে সমস্যার মাত্রা উভয়ের মধ্যেই প্রায় সমান।
 
এই সংকট মোকাবিলায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির অশান্ত পরিবেশ, বাবা-মায়ের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া এবং আবেগগত অস্থিরতা শিশুদের মানসিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। স্কুল ও কলেজে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আচরণ, উপস্থিতি ও পড়াশোনার মানে আসা পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে আগে লক্ষ্য করতে পারেন। সময়মতো এসব লক্ষণ চিহ্নিত করে অভিভাবক ও কাউন্সেলরদের জানানো গেলে বহু তরুণের জীবন সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপ্রেশনকে হালকাভাবে নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদি কারও মধ্যে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গভীর বিষণ্ণতা, খিটখিটে মেজাজ, ঘুম বা ক্ষুধায় পরিবর্তন, নিরাশা কিংবা নিজেকে ক্ষতি করার চিন্তা দেখা যায়, তবে অবিলম্বে পেশাদার কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই মানসিক সমস্যাগুলো আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কাশ্মীরে আত্মহত্যার বাড়তে থাকা ঘটনাগুলোকেও এই মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গেই যুক্ত করে দেখা হচ্ছে।
 
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কাশ্মীরে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো, সামাজিক কলঙ্ক ভাঙা এবং কাউন্সেলিংকে একটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব যদি শারীরিক স্বাস্থ্যের সমানভাবে স্বীকৃতি না পায়, তবে উপত্যকার এই নীরব সংকট ক্রমেই আরও গভীর ও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।