স্বাস্থ্যসাথী থেকে আয়ুষ্মান ভারত: পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ‘যুগান্তকারী পরিবর্তন’-এর ঘোষণা শুভেন্দুর
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল রাজ্য সরকার। নবান্নে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, এতদিন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ৬ কোটি মানুষকে এবার কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে নতুন আবেদনকারীদের জন্যও খুলে দেওয়া হবে স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, আগের রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলির সঙ্গে সমন্বয় না করায় বহু মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে পশ্চিমবঙ্গ সেই সব সুবিধা পায়নি, যা দেশের অন্যান্য রাজ্যের মানুষ পেয়েছেন। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী নতুন রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
শুভেন্দু জানান, ইতিমধ্যেই আয়ুষ্মান ভারতে নাম নথিভুক্ত করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজ্য সরকারের আশা, আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই উপভোক্তাদের হাতে নতুন কার্ড তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ডধারীদের সরাসরি আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় আনার প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে দাবি তাঁর। পাশাপাশি যাঁরা আগে কোনও সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, তাঁরাও এবার নতুন করে আবেদন করতে পারবেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর হবে। সেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রী এবং আধিকারিকেরা উপস্থিত থাকবেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় এক কোটি বাসিন্দা যাঁরা অন্য রাজ্যে কাজ বা বসবাস করেন, তাঁরাও এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
এ দিন স্বাস্থ্য পরিষেবার আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে সার্ভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হবে আগামী ৩০ মে থেকে। প্রথম পর্যায়ে ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সি কিশোরীদের এই প্রতিষেধক দেওয়া হবে। বিধাননগর সাব-ডিভিশন হাসপাতালে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই প্রকল্পের সূচনা করবেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই। একই দিনে শুরু হবে টিবি-মুক্ত ভারত কর্মসূচির বিশেষ ওয়ার্কশপও।
সাধারণ মানুষের ওষুধের খরচ কমাতে রাজ্যে ৪৬৯টি প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই কেন্দ্রগুলিতে দুরারোগ্য রোগের ওষুধেও প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় মিলবে। ২০০০ টাকার ওষুধ মাত্র ২০০ টাকায় পাওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।রাজ্যের প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, আসানসোল এবং দক্ষিণ দিনাজপুর— এই চার প্রশাসনিক জেলায় মেডিক্যাল কলেজ নেই বলে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রের কাছে প্রয়োজনীয় জমি ও পরিকাঠামোগত প্রস্তাব পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে একটি AIIMS গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন।
স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি শিশুমৃত্যুর হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুহার রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলায় আশঙ্কাজনক। বিশেষ করে কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম ও মালদহ জেলার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
সবশেষে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যখাতের জন্য কেন্দ্র সরকার ২১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং তার এক-চতুর্থাংশ ইতিমধ্যেই রাজ্যের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। তাঁর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে, যার সুফল খুব দ্রুতই মানুষ পেতে শুরু করবেন।”