গুয়াহাটি ঃ
অসমের মাটি, মানুষের অনুভূতি আর মানবতার সুর যাঁর কণ্ঠে এক হয়ে ধ্বনিত হয়েছে, সেই প্রয়াত শিল্পী জুবিন গার্গ-এর স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত হলো এক আবেগঘন ও গাম্ভীর্যপূর্ণ স্মরণসভা। সংগীত, সমাজচিন্তা ও মানবিকতার যে দীপ তিনি জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, তার আলোয় ভিজে ওঠে অনুষ্ঠানমঞ্চ ও উপস্থিত প্রতিটি মন।
গুয়াহাটির গুয়াহাটি প্রেস ক্লাব-এ আয়োজিত এই স্মরণ অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয় দুই সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন—দেশ ভাবনা (কলকাতা) এবং কৃষ্টি পথার অসম। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। জুবিন গার্গের জীবন ও সৃষ্টির কথা উঠতেই বহু মানুষের চোখে জল দেখা যায়। স্মরণসভা থেকে বারবার উঠে আসে একটাই দাবি—অসমের সংস্কৃতি, সংগীত ও মানবিক চেতনায় অনন্য অবদান রাখা এই শিল্পীকে মরণোত্তর ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হোক।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই জুবিন গার্গের বহুমুখী অবদান স্মরণ করা হয়। বক্তারা বলেন, তিনি কেবল একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ এক মানবিক মানুষ। সংগীতের পাশাপাশি সমাজচিন্তা, পরিবেশ-সচেতনতা ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান আজও বহু মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস। তাঁর গান যেমন হৃদয়ে দাগ কেটেছে, তেমনি তাঁর চিন্তা সমাজকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
এই স্মরণসভায় সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্মারক সম্মাননা প্রদান করা হয় একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে। সম্মানপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন রাজীবাক্ষ রক্ষিত, সুদীপ শর্মা চৌধুরী, অরূপ চক্রবর্তী, মৃণাল সরকার, আজহার আলম, অনুপমা ডেকা এবং জ্যেষ্ঠ সমাজকর্মী আব্দুল লতিফ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সমাজ ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় তাঁদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সঙ্গীত সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে কণ্ঠশিল্পী মিতুল বর্মন ও কণ্ঠশিল্পী বিজয় বিশ্বাস-কে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয়। শুধু তাই নয়, এই দুই কণ্ঠশিল্পী তাঁদের কণ্ঠে দুটি গান পরিবেশন করে প্রয়াত শিল্পীর প্রতি গভীর সঙ্গীতাঞ্জলি নিবেদন করেন। তাঁদের আবেগঘন পরিবেশনা অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য ও আবেশকে আরও গভীর করে তোলে।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আব্দুল জলিল বলেন, “জুবিন গার্গ ছিলেন এক মহামানব। তিনি অমর, অজেয়। তাঁর কর্ম ও চিন্তা চিরকাল মানুষকে পথ দেখাবে।” সাংবাদিক সুদীপ শর্মা চৌধুরী বলেন, “জুবিন গার্গকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব। তিনি শুধু শিল্পী নন—প্রকৃতি, গাছপালা ও জীবজন্তুর প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। মানবতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে তিনি জনমানসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবেন।” স্মরণসভায় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শিশু শিল্পী সায়ন রায়। এছাড়াও কলকাতা, ত্রিপুরা ও অসমের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিল্পীরা গান ও কবিতায় প্রয়াত শিল্পীকে স্মরণ করেন। প্রখ্যাত শিল্পী প্রলয় রায়-এর স্বরলিপিতে শিল্পীবৃন্দের পরিবেশিত গান ও আবৃত্তি অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
কলকাতা, ত্রিপুরা ও অসমের শিল্পীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে স্মরণসভাটি এক সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করে। কলকাতার অ্যাকশন গ্রুপ এই অনুষ্ঠানের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পাশে ছিল। অনুষ্ঠানে দেশ ভাবনার পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দেব কিশোর চক্রবর্তী এবং কৃষ্টি পথার অসমের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন মহানন্দ দত্ত সরকার। দেশ ভাবনার পক্ষে সংস্থার অন্যতম প্রধান শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ ।তাঁরা জানান, জুবিন গার্গের আদর্শ, গান ও মানবিক মূল্যবোধ আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই স্মরণসভার মূল লক্ষ্য।
সমগ্র অনুষ্ঠান শেষে সর্বসম্মতভাবে আবারও জোরালো দাবি তোলা হয়—অসমের সাংস্কৃতিক ও মানবিক চেতনায় অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জুবিন গার্গকে মরণোত্তর ভারতরত্ন প্রদান করা হোক। গভীর নীরবতা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে স্মরণসভা শেষ হয়, রেখে যায় এক দৃঢ় প্রত্যয়—শিল্পীর সৃষ্টিকে ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।