শতানন্দ ভট্টাচার্য
অসমের শিলচরের ছেলে রাজদীপ চৌধুরী। দেখতে খুব শান্ত, ভদ্র এবং কথাবার্তা, চালচলন সবকিছুতেই রয়েছে শিক্ষা ও সংস্কারের ছাপ। রাজদীপ আসলে খুব মেধাবী ছাত্র, খেলোয়াড় এবং অভিনেতা। কিন্তু দেখতে খুবই সাধারণ এই মানুষটি ইতিমধ্যেই হলিউড ও বলিউড দুটোতেই নাম করে ফেলেছেন।
ইতিমধ্যে 'অ্যা টিচার্স গিফ্ট' নামের ইংরেজি ছবিতে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। ইংরেজি এই ছবিটিতে মুখ্য চরিত্রের রূপদান করেছেন রাজদীপ চৌধুরী। ছবিটির চিত্রনাট্যও রচনা করেছেন তিনি। প্রায় ১৭ বছর আগে চাকরিসূত্রে লন্ডনে যান তিনি এবং বর্তমানে পাকাপাকিভাবেই লন্ডনে থাকেন।কিছুদিন আগে তিনি পুজোতে শিলচরে আসেন এবং তখনই ঘরোয়া পরিবেশে ইংরেজি ও হিন্দি সিনেমার বিষয় নিয়ে কথা হয়।
এবার রাজদীপ অভিনীত ইংরেজি ছবিটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। 'অ্যা টিচার্স গিফ্ট' ছবিটি সম্প্রতি ইউকে এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল চলচ্চিত্র পুংসেরা ব্রিটিশ এশিয়ান পায়। লন্ডন ইউকে ফিল্মসের নিবেদনে ওই ছবিটির পর্তুগিজ পরিচালক আর্থার রিবেইরো।
লন্ডনের একজন উচ্চাভিলাষী হিন্দি ভাষার শিক্ষক একজন স্মার্ট ভারতীয় মহিলার সাথে বিবাহের জন্য চাপের মধ্যে ছিল। তবে এক পরিশীলিত ইংরেজের সাথে একটি অপ্রত্যাশিত বৈঠক তাকে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাদের অতীত এবং বর্তমান নিয়ে গড়ে ওঠা দ্বন্দ্বই এই ছবির অন্যতম বিষয় বলেই জানালেন রাজদীপ। রাজদীপের সঙ্গে ছবিটিতে অভিনয় করেছেন অঞ্জলি পাতিল, অ্যান্থনি কাফ, ধ্রুব সায়গল, বরুণ বুদ্ধদেব, পাওলা লোবো অ্যানটিউন্স এবং সুরেশ মেনন। সেই ছবিটি নিউইয়র্কে আসন্ন ট্রাইবেকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জন্যও নির্বাচিত হয়েছে।
রাজদীপ চৌধুরী খেলোয়াড় ও অভিনেতা
রাজদীপ শিলচরে 'চয়ন' নামেই বিখ্যাত। তাঁর সোজা কথায় নিজের মেধা, কর্মদক্ষতা, নিয়মানুবর্তিতা এসবকে সঙ্গী করেই তিনি আজকের 'রাজদীপ চৌধুরী'। আগামী ডিসেম্বরে মাসেই তাঁর নতুন ছবি 'শিমূলাক্রা' মুক্তি পাচ্ছে বলে জানান।ছবিটির নির্দেশনায় রয়েছেন পঙ্কজ সাওন্ত এবং অভিনয় করেছেন আলিশা ভাট, অক্ষরা হাসান, গান্ধার বাবরে।
পরিচালক শচিন কারান্ডের 'জ্যাক অ্যান্ড দিল' ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে রাজদীপের চলচ্চিত্র জগতে আসেন। আর আশ্চর্যজনকভাবে এই ছবিটি মুক্তি পাবার পর তাঁর নিজের শহর শিলচরের একটি ডিজিটাল সিনেমা হলে একসপ্তাহ হাউসফুল ছিল। আসলে নবপ্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জেনে নিয়েছিল যে শিলচরের রাজদীপ ওই ছবিতে অভিনয় করেছে। এরপর ভূষণ প্যাটেলের পরিচালনায় 'ডেঞ্জারাস' ছবিতে বিপাশা বসুর সঙ্গে অভিনয় করেছেন। রিতেশ দেশমুখের সঙ্গে শাহাদ আলির পরিচালনায় অভিনয় করেছেন 'মিস্টার মাম্মি' ছবিতেও। বর্তমানে 'ইন্ডিয়া উইথ এরিক জি'-এর শুটিংয়ের কাজে মিজোরাম হয়ে মায়ানমার যান। আন্তর্জাতিক ওই বিশাল প্রকল্পের শিলচর শহরকেও জুড়ে দেওয়া হয় রাজদীপের অনুরোধে। রাজদীপের কথায় 'পরিশ্রম' আর 'অধ্যবসায়' এই দুটো শব্দের কোনো বিকল্প নেই মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের ক্ষেত্রে। এবং সত্যিই তিনি নিজের জীবনে তা করেও দেখিয়েছেন। শিলচর শহরের সুভাষনগর এলাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রঞ্জিত চৌধুরী এবং প্রয়াত রুবি চৌধুরীর একমাত্র ছেলে হচ্ছেন রাজদীপ চৌধুরী। শিলচরের হলিক্রস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে মাধ্যমিক অব্দি পড়াশুনা করেন। এরপর শিলচরেরই ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুচরণ কলেজ (বর্তমানে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম স্থান দখল করে সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর পুনে শহরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে বেরিয়ে আসেন এবং স্কলারশিপ পেয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান এম বি এ পড়ার জন্যে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সেখানেই পড়াশুনা শেষ করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চাকরি পেয়ে যান।
তখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হয় দক্ষতার সাথে ক্রিকেটও খেলেন। শিলচরেও সুনামের সাথে ক্রিকেট খেলেছেন ছাত্রাবস্থায়। এবং লন্ডনেও খেলোয়াড় হিসেবে খুব সুখ্যাতি অর্জন করেন। ইংরেজী সংস্কৃতির সঙ্গে এত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকেও তাঁর নিজের সংস্কৃতি ও মাটির প্রতি নিবিড় টান বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোয় চলে আসেন শিলচরেই।