আশহার আলম / নয়া দিল্লি
সঙ্গীতের কিংবদন্তি এ. আর. রহমান বিবিসির এক সংবাদ উপস্থাপককে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বলিউডে শিল্পীর ধর্ম নিয়ে করা মন্তব্য ঘিরে যখন বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সময় জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শাহজাদ আলী স্মরণ করলেন তাঁর সংগ্রামের দিনগুলো, যখন সঙ্গীত পরিচালক বিশাল দাদলানি নীরবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ব্লকবাস্টার ছবি ধুরন্ধর-এর শাহজাদ আলীর গান, “না তু কারওয়াঁ কি তলাশ হ্যায়…”, ইতিমধ্যেই সব রেকর্ড ভাঙতে শুরু করেছে।
রাজস্থানের দাগর পরিবারের সন্তান শাহজাদ আলীর বলিউডে প্রথম বড় কাজ ছিল 'সুলতান' ছবির গান “উপর আল্লাহ, নিচে ধরতি…”, যেখানে তিনি সুখবিন্দর সিংহের সঙ্গে ব্যাকিং সিঙ্গার হিসেবে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। সেই সময়কার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “শুরুর দিকে আমার কোনো ক্রেডিট–ই দেওয়া হয়নি, কারণ ব্যাক সিঙ্গিংয়ে অনেক সময় গায়কের নাম আসে না। কিন্তু বিশালজি প্রোডাকশন টিমের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটার নাম অবশ্যই দিতে হবে।’
নামের অনুপস্থিতি তাঁকে হতাশ করেনি, কিন্তু বিশালের সেই সমর্থন ছিল বলিউডে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে এক অমূল্য প্রেরণা। তিনি বলেন, “অনেকদিন পরে জানতে পারি, শেষ মুহূর্তে হলেও ছবির ক্রেডিটে আমার নাম যোগ করা হয়েছিল।”
আজ ৩৪ বছর বয়সে শাহজাদ সেই স্বীকৃতিহীন দিনগুলো থেকে বহু দূর এগিয়ে গেছেন। ধুরন্ধর-এর গানের সাফল্যের পর বিজয় বিক্রম সিংহের এক পডকাস্টে তিনি নিজের পথচলার গল্প শোনান। বলিউডে গান গাওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি ছোটবেলা থেকেই মুম্বইয়ের হোটেল–রেস্টুরেন্ট ঘুরে গান গাইতে শুরু করেছিলেন। তাঁর নিজের কথায়, “ছোট থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম, বলিউডই হবে আমার কর্মক্ষেত্র, সঙ্গীতই হবে আমার জীবিকা।”
কিন্তু এই পথ ছিল কঠিন। আজও তাঁর চোখে ভাসে সেই ১২টি দিনের কঠিন স্মৃতি, যখন তিনি ও তাঁর বাবা মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজের পাকিজা হোটেলের কাছে ফুটপাতে শুয়ে রাত কাটিয়েছিলেন। তিনি স্মরণ করেন, “আমাদের থাকার ঘরটি এতটাই ছোট ছিল যে একবারে একজনই শুতে পারত। আমি দিনে রেস্টুরেন্ট-হোটেল ঘুরে কাজ খুঁজতাম, যাতে গান গেয়ে অন্তত খাবারের খরচটুকু উঠে আসে।” মায়ের প্রতিটি সঞ্চিত টাকাই তাঁর সঙ্গীত-শিক্ষার জন্য ব্যয় হয়েছিল, সে স্মৃতিই তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে সাফল্যের পথে।
'ধুরন্ধর'-এর জোয়ার আসার আগেই শাহজাদ ধীরে ধীরে নিজের কেরিয়ারের ভিত গড়ে তুলেছিলেন। 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' -এ “হাম দেখেঙ্গে” গানের ভোকাল এনসেম্বলে ছিলেন তিনি। বলিউডে তাঁর প্রাথমিক কাজের মধ্যে ছিল ' সুলতান ' (২০১৬), এরপর ওয়েব সিরিজ আশ্রম-এর টাইটেল ট্র্যাক এবং কোড নেম: তিরঙ্গা–র “দমাদম মস্ত কালান্দর”, যা তাঁকে সুফি ও প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তাঁর জীবনের বড় বাঁক আসে যখন তিনি সঙ্গীতকার শাশ্বত সচদেব ও পরিচালক আদিত্য ধরের সঙ্গে “ইশক জলাকর” গানে কাজ করেন। ৬৫ বছর পুরোনো একটি কাওয়ালির আধুনিক রূপ, যা প্রায় রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। গানটি মুক্তির সময় তিনি ছিলেন নিজের শহর বিকানেরে, আর সেই রাতেই তাঁর নাম পৌঁছে যায় বলিউডের আলোচনার কেন্দ্রে।
রণবীর সিং ও শাহজাদ আলী
'ধুরন্ধর '- এর সাফল্য তাঁর জীবন বদলে দেয়। ছবির মিউজিক রিলিজ অনুষ্ঠানে রণবীর সিং তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “তোমার কণ্ঠ যেন বিদ্যুৎ!” প্রায় ২০ বছর অচেনা হয়ে থাকা এক গায়ক, যে একসময় মুম্বইয়ের খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে ঘুমাত, শেষপর্যন্ত তারকাদের ভিড়ে নিজের স্থান দখল করে নেয়।
খ্যাতি আজ তাঁর সঙ্গী হলেও, শাহজাদ আলী এখনো বিনয়ী। তাঁর ভাষায়, “ফুটপাতে কাটানো সেই ১৫ দিন আমাকে জীবনের যে শিক্ষা দিয়েছে, তা কোনো সংগীতশিক্ষাও দিতে পারত না।”
মুম্বইয়ের পথ থেকে বলিউডের ঝলমলে আকাশ, ৩৪ বছর বয়সী শাহজাদ আলীর লড়াই, অধ্যবসায় ও প্রেরণার এই গল্প আজ বিশ্বজুড়ে শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণা, এক আবেগ, এক অনন্য বিজয়ের সনদ।