স্কুলের ঘণ্টা বেজেছিল মৃত্যুর আগে, প্রধান শিক্ষকের দূরদর্শিতায় বেঁচে গেল ১,৬৪৩টি অমূল্য প্রাণ
দেবকিশোর চক্রবর্তী
সকাল ৯টা ২০ মিনিট। নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তখন চলছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই পঠনপাঠন। শ্রেণিকক্ষে বই খুলে বসে পড়ুয়ারা। শিক্ষকরা ব্যস্ত পড়ানোয়। বাইরে পাহাড়ি সকাল, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ত্রিশূলী নদী। কেউ তখনও জানতেন না, কয়েক মিনিটের মধ্যে এই স্বাভাবিক ছবিটাই বদলে যাবে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নে।
ঠিক সেই সময় ফোন এল প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াড়ির কাছে। উজানের একটি গ্রাম জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। নদীর জল দ্রুত বাড়ছে। বিপদ নেমে আসছে ত্রিশূলীর দিকে।৪৭ বছরের প্রধান শিক্ষক এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি।স্কুলের তিনতলা কংক্রিটের ভবনটি নদীর পাড় থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে। বাইরে থেকে দেখলে নিরাপদই মনে হতে পারে। কিন্তু পাহাড়ি নদীর আচরণ যে মুহূর্তে বদলে যায়, তখন নিরাপদ বলে কিছু থাকে না—এই কথাটাই যেন বুঝে গিয়েছিলেন দাওয়াড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক অভিভাবক ছুটে এসে জানালেন, নদীর জল অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়ছে।
তারপরই বেজে উঠল স্কুলের ঘণ্টা।সেটি ক্লাস শুরুর ঘণ্টা নয়। ছুটির ঘণ্টাও নয়। সেটি ছিল বিপদের ঘণ্টা।রাজেন্দ্র দাওয়াড়ি সমস্ত শিক্ষককে নির্দেশ দিলেন, শ্রেণিকক্ষ খালি করে পড়ুয়াদের দ্রুত উঁচু জায়গায় নিয়ে যেতে। কোনও পড়ুয়া যেন পিছনে না থাকে। আতঙ্কের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রেখে একে একে স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করল ছাত্রছাত্রীরা।
স্কুলবাসগুলির কথাও ভুললেন না প্রধান শিক্ষক। কয়েকটি বাস তখন পড়ুয়া নিয়ে পথে। চালকদের ফোন করে বাস ঘুরিয়ে ফিরে আসতে বললেন তিনি। কিন্তু একটি বাসের চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কিছুক্ষণ পর দাওয়াড়ি দেখতে পেলেন, বাসটি সেতু পার হচ্ছে।তারপর ঘটে গেল আরও ভয়ঙ্কর ঘটনা।বাসটি সেতুর অন্য প্রান্তে পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল স্রোতে ভেঙে পড়ল সেই সেতু।এদিকে স্কুলের পড়ুয়ারা তখন পাহাড়ের দিকে ছুটছে। চারদিকে আতঙ্ক। কেউ দৌড়চ্ছে, কেউ কাঁদছে। এক ছাত্রী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরবাইকে করে দ্রুত উঁচু জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাকিরা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে হেঁটে এগিয়ে যায় নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে।
রাজেন্দ্র দাওয়াড়ি তখনও তাঁদের সঙ্গে। সামনে তাকাচ্ছেন, আবার পিছনেও ফিরছেন। তাঁর চোখে যেন তখন একটাই প্রশ্ন—সবাই কি বেরিয়ে এসেছে?শেষ পর্যন্ত ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া পৌঁছল নিরাপদ উঁচু জায়গায়। একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নিল তারা।আর তারপরই ত্রিশূলী উপত্যকার দিকে নেমে এল প্রকৃতির ভয়ঙ্করতম রূপ।পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই স্রোত শুধু জল ছিল না। তার সঙ্গে ছিল বরফ, পাথর, কাদা এবং বিপুল ধ্বংসাবশেষ। লাংটাং লিরুং শৃঙ্গ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে লেন্দে খোলা নদীর গিরিখাতে গিয়ে পড়েছিল। তার অভিঘাতে তৈরি হয়েছিল প্রবল স্রোত। ভূ-আকৃতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ভেঙে পড়া অংশটির বিস্তার ছিল প্রায় ৫০ একর। সেই বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদীর স্রোতের সঙ্গে মিশে ছুটে এসেছিল ত্রিশূলী উপত্যকার দিকে।কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই স্রোত আছড়ে পড়ল স্কুলের দিকে।
চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেল স্কুলভবন। ভেঙে পড়ল সেতু। তছনছ হয়ে গেল আশপাশের ঘরবাড়ি। যে জায়গায় কিছুক্ষণ আগেও ১,৬৪৩ জন পড়ুয়ার কোলাহল ছিল, সেখানে তখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ।কিন্তু শিশুরা সেখানে ছিল না।তারা তখন নিরাপদ দূরত্বে।প্রধান শিক্ষক দাওয়াড়ির সিদ্ধান্ত যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বোঝা যায় বিপর্যয়ের পরের ঘটনাতেও। এই ভয়াবহ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক সন্তোষ পারিয়ার এবং পরিচারক সুলতান লামা। সন্তোষ নদীর ধারের নিজের ঘরে রান্না করতে ফিরে গিয়েছিলেন। সুলতান স্কুলের দরজা বন্ধ করতে ফিরে যান। ভয়াবহ স্রোত তাঁদের আর ফিরতে দেয়নি।
একই স্রোত কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটি স্কুল, একটি সেতু এবং বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু ১,৬৪৩টি শিশুকে ছুঁতে পারেনি।কারণ, বিপদ আসার কয়েক মিনিট আগেই একজন মানুষ বুঝেছিলেন কী করতে হবে।রাজেন্দ্র দাওয়াড়ির হাতে ছিল না কোনও বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম। ছিল না দীর্ঘ পরিকল্পনা করার সময়। ছিল শুধু একটি সতর্কবার্তা, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস।
তিনি যদি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেন? যদি স্কুলভবনকে নিরাপদ ভেবে পড়ুয়াদের সেখানেই থাকতে বলতেন? যদি বাসগুলিকে ফেরানোর উদ্যোগ না নিতেন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর হয়তো কোনওদিন জানা যাবে না। শুধু জানা যাবে, সেদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটের পর নেওয়া কয়েকটি দ্রুত সিদ্ধান্ত ১,৬৪৩ জন ছাত্রছাত্রীর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।বিপর্যয়ের মুহূর্তে বড় বড় পরিকল্পনার সুযোগ থাকে না। থাকে কয়েকটি সেকেন্ড, কয়েকটি মিনিট। সেই সময় কে কী সিদ্ধান্ত নেন, তার উপর কখনও কখনও নির্ভর করে শত শত প্রাণের ভাগ্য।
ত্রিশূলীর সেই সকালে স্কুলের ঘণ্টা তাই শুধু একটি ঘণ্টা ছিল না। সেটি ছিল মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের ডাক।প্রকৃতি তার সমস্ত শক্তি নিয়ে এসেছিল। স্কুলবাড়ি ভেঙেছে, সেতু ভেঙেছে, ঘরবাড়ি ভেসেছে। দুজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।কিন্তু ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া বেঁচে গেছে।কারণ মৃত্যুর স্রোত পৌঁছনোর আগেই একজন প্রধান শিক্ষক বলে দিয়েছিলেন—সবাই বেরিয়ে যাও। এখনই।সেদিন ত্রিশূলীর পাহাড়ে সেই নির্দেশই হয়ে উঠেছিল ১,৬৪৩টি প্রাণের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।