দেবকিশোর চক্রবর্তী
বাংলা–বিহার সীমান্তের প্রত্যন্ত ফারাক্কা গ্রামে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,‘গাছের স্কুল’। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী অংশুমান ঠাকুরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই উন্মুক্ত বিদ্যালয় বর্তমানে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে।
অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অনটন, যোগাযোগ-সঙ্কট ও পরিকাঠামোর অভাবে শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে। নিকটবর্তী সরকারি স্কুলে পৌঁছতে গেলে কাঁচা রাস্তা ও দুর্বল পরিবহণ ব্যবস্থার কারণে বহু শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারে না। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে দুই বছর আগে অংশুমান প্রকৃতি-নির্ভর শিক্ষাদর্শ নিয়ে শুরু করেন ‘গাছের স্কুল’।
শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী অংশুমান ঠাকুরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত উন্মুক্ত বিদ্যালয় শিশুরা
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বদলে রয়েছে বড় বড় গাছের ছায়া, বাঁশের কাঠামো ও খোলা আকাশ। প্রথম দিকে হাতে গোনা কয়েকজন শিশু নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে প্রায় ৭০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়মিত এখানে পাঠ নেয়। বাংলা, গণিত ও পরিবেশবিদ্যার পাশাপাশি শেখানো হয় কৃষিকাজ, নদী-সংস্কৃতি, স্থানীয় ইতিহাস, জলবায়ু পরিবর্তন, বীজ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে গান, নাচ, নাটক, ছবি আঁকা ও ছড়া লেখাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পাঠক্রমে।
এখানে পরীক্ষার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; বরং মাসে একবার ‘শেখার উৎসব’-এ শিশুরা নিজেদের শেখা বিষয় নাটক, গল্প বা গান মারফত উপস্থাপন করে। অংশুমানের কথায়, “শিক্ষা মুখস্থ বিদ্যা নয়; আনন্দ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখাই প্রকৃত শিক্ষা।”
শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী অংশুমান ঠাকুরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত উন্মুক্ত বিদ্যালয়
বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যয় মেটাতে অংশুমান নিজে হস্তশিল্প ও পরিবেশবান্ধব সামগ্রী তৈরি করে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে বিক্রি করেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্যোগটির কথা ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে বই-খাতা, মাদুর ও আর্থিক সহায়তা পাঠাতে শুরু করেছেন। স্থানীয় মানুষও ধীরে ধীরে শামিল হচ্ছেন এই উদ্যোগে।
অংশুমানের পরিকল্পনা, ভবিষ্যতে ফারাক্কার আশেপাশের আরও কয়েকটি গ্রামে একই ধরনের প্রকৃতি-ভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা। তাঁর বিশ্বাস, “গ্রাম যখন প্রকৃতিনির্ভর, তখন শিক্ষাও প্রকৃতিকে ছুঁয়ে থাকলে তবেই তা টিকে থাকে।”
শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী অংশুমান ঠাকুরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত উন্মুক্ত বিদ্যালয়
ফারাক্কার নির্জন প্রান্তে গাছের তলে জন্ম নেওয়া এই স্কুল আজ বহু শিশুর জীবনে পরিবর্তন আনছে। সীমান্ত অঞ্চলে এক সবুজ, মানবিক শিক্ষাবিপ্লবের দিশা দেখাচ্ছে অংশুমানের ‘গাছের স্কুল’।