শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পরীক্ষা শেষের মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে প্রকাশিত হল ২০২৬ সালের আইসিএসই (দশম) এবং আইএসসি (দ্বাদশ) পরীক্ষার ফলাফল। কাউন্সিল ফর দ্য ইন্ডিয়ান স্কুল সার্টিফিকেট এগজ়ামিনেশন (CISCE) এ বছরের ফল ঘোষণার মাধ্যমে শুধু দ্রুততার নজিরই গড়ল না, বরং দেশের শিক্ষার মানচিত্রে স্পষ্ট করে দিল কোন অঞ্চল এগোচ্ছে, কোথায় ছাত্রীরা আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে, আর কোথায় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।
এ বছর আইসিএসই-তে সর্বভারতীয় পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯.১৮ শতাংশ। মোট ২ লক্ষ ৫৮ হাজার ৭২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লক্ষ ৫৬ হাজার ৫৯০ জন। অন্য দিকে, আইএসসি-তে পাশের হার ৯৯.১৩ শতাংশ। দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষায় বসেছিল ১ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া, যার মধ্যে উত্তীর্ণ ১ লক্ষ ২ হাজার ৪১৪ জন। সংখ্যার বিচারে ফলাফল অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও, এই পরিসংখ্যানের আড়ালে উঠে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রবণতা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, দুই পরীক্ষাতেই ছাত্রীরা আবারও ছেলেদের পিছনে ফেলেছে। আইসিএসই-তে ছাত্রীদের পাশের হার ৯৯.৪৬ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের ৯৮.৯৩ শতাংশ। একই ছবি আইএসসি-তেও— ছাত্রীদের সাফল্যের হার ৯৯.৪৮ শতাংশ, ছাত্রদের ৯৮.৮১ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের স্কুলশিক্ষায় মেয়েদের ধারাবাহিক অগ্রগতি আরও একবার প্রমাণ করল, সুযোগ পেলে তারা শুধু সমান নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে।
তবে এই ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আঞ্চলিক পারফরম্যান্স। দশম শ্রেণিতে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলি ৯৯.৮৫ শতাংশ পাশের হার নিয়ে সবার শীর্ষে। অর্থাৎ শিক্ষাগত প্রতিযোগিতায় পশ্চিম ভারতের স্কুলগুলির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। অন্য দিকে দ্বাদশে সেরার আসন দখল করেছে দক্ষিণ ভারত, যেখানে পাশের হার ৯৯.৮৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান শুধু ফল নয়, বরং বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষা-পরিকাঠামো, প্রস্তুতি ও পরীক্ষাভিত্তিক সক্ষমতারও প্রতিফলন।
পশ্চিমবঙ্গের চিত্রও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য থেকে এ বছর আইসিএসই-তে ৪৫৭টি স্কুল এবং আইএসসি-তে ৩৪৮টি স্কুল অংশ নেয়। দশমে ৪৪ হাজার ৪১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ৪৩ হাজার ৮৯৭ জন, পাশের হার ৯৮.৮৪ শতাংশ। দ্বাদশে ২৮ হাজার ৭৯১ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ ২৮ হাজার ৪৭৩ জন, পাশের হার ৯৮.৯০ শতাংশ। সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় সামান্য পিছিয়ে থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গ তার স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। এখানেও রাজ্যের ছাত্রীরাই ফলাফলে এগিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল দেখাচ্ছে শুধু পরীক্ষায় সাফল্য নয়, বরং শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পরিবর্তনের বাস্তব ছবি। শহর ও মফস্সল মিলিয়ে বহু পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি বাড়তি গুরুত্ব এবং স্কুলগুলির ধারাবাহিক সহায়তা এই সাফল্যের বড় কারণ হতে পারে।
এ বার ফল প্রকাশের সময়সীমাও ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দশমের পরীক্ষা শেষের ৩০ দিনের মাথায় এবং দ্বাদশের ২৬ দিনের মাথায় ফল প্রকাশ করে CISCE কার্যত দ্রুত মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা, ভর্তি প্রক্রিয়া বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পড়ুয়ারা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় পাবে।
তবে ফলাফলেই সব শেষ নয়। কাউন্সিল জানিয়েছে, ১ মে থেকে ৪ মে পর্যন্ত খাতা রিভিউয়ের সুযোগ থাকবে। যাঁরা নম্বর পুনর্মূল্যায়ন চান, তাঁরা এই সময়ের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি ৮ মে থেকে ১৪ মে পর্যন্ত ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষার জন্য পুনরায় নথিভুক্তকরণ চলবে। উন্নয়নমূলক পরীক্ষা হবে ১৫ জুন এবং তার ফল জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ, CISCE এবার শুধু ফল প্রকাশেই নয়, পড়ুয়াদের ‘দ্বিতীয় সুযোগ’-এর দিকেও জোর দিয়েছে।
শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, এই ফলাফল ভারতের স্কুলশিক্ষার একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত— যেখানে উচ্চ পাশের হার এখন আর একমাত্র খবর নয়; বরং অঞ্চলভিত্তিক প্রতিযোগিতা, মেয়েদের ধারাবাহিক সাফল্য এবং দ্রুত প্রশাসনিক পরিকাঠামোই ভবিষ্যতের শিক্ষার মূল সূচক হয়ে উঠছে।
২০২৬-এর CISCE ফল তাই শুধুই নম্বরের খতিয়ান নয়, বরং দেশের শিক্ষা-বাস্তবতার এক বিস্তৃত প্রতিচ্ছবি— যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি সামনে এসেছে পরিবর্তনের দিশাও।