বিজেপির দাপটের মুখেও সংখ্যালঘু প্রার্থীরাই কি বিরোধীদের শেষ ‘অক্সিজেন’? অসম লড়াইয়ে টিকে রইল ‘বিকল্প’ কণ্ঠস্বর
তরুণ নন্দী / কলকাতা
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে রাজ্যজুড়ে শুধুই যেন গেরুয়া ঝড়। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, গোটা বাংলা জুড়ে ভারতীয় জনতা পার্টির একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা গেল। গেরুয়া শিবিরের এই অভাবনীয় সাফল্যের মাঝেও বেশ কিছু নির্বাচনী ফলাফল নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল এবং বাম-কংগ্রেস শিবিরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জয় এই নির্বাচনের সমীকরণকে কিছুটা হলেও ভাবাচ্ছে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছে মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্রটি। গত বিধানসভায় শূন্য হাতে ফেরা বামফ্রন্টের জন্য এই কেন্দ্রটি এবার কার্যত অক্সিজেন এনে দিল। সিপিআই(এম) প্রার্থী মহম্মদ মোস্তফিজুর রহমানের জয় আসলে বিধানসভায় বামেদের পৌঁছানোর লড়াইয়ে এগিয়ে রাখল।
বিজেপির বিপুল জয়ের খবর মিলতেই দেখা যায় অনেক হেভিওয়েট ধরাশায়ী হয়েছেন। কিন্তু গেরুয়া ঝড়ের মধ্যেও ডোমকল কেন্দ্রে বামপ্রার্থীর এই জয় প্রমাণ করে দিল তৃণমূল ও বিজেপির দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরেও বামপন্থী আদর্শের প্রতি জনভিত্তি এখনও রয়েছে। মহম্মদ মোস্তফিজুর রহমানের এই জয়লাভ আগামী দিনে রাজনীতিতে বামেদের অস্তিত্বের লড়াইকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলল।
বামপ্রার্থীর পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক ময়দানে জাতীয় কংগ্রেস নিজের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফরাক্কা থেকে মহতাব শেখ এবং রানিনগর থেকে জুলফিকার আলি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। এই প্রার্থীরা জিতে আসায় বোঝা গেল মুর্শিদাবাদ জেলাটি থেকে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় কেন্দ্র থেকে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) প্রার্থী নওসাদ সিদ্দিকীও বিপুল ভোট জিতে নিজের আধিপত্য ধরে রাখলেন। তিনি ফের ভাঙড় কেন্দ্র থেকে জিতে বোঝালেন, শাসকদলের প্রবল চাপের মুখেও নির্দিষ্ট কিছু পকেটে আঞ্চলিক ও ধর্মীয় সমীকরণের আবেদন এখনও অটুট রয়েছে এই বিধানসভায়।
তবে উত্তরবঙ্গে বিজেপির ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে গোয়ালপোখর কেন্দ্রটি। এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী মোঃ গোলাম রব্বানী বিপুল ভোটে জিতেছেন। অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গের হাড়োয়া কেন্দ্রটিকে নিয়ে নজরে রেখেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। হাড়োয়ায় সমাজকর্মী মুফতি আব্দুল মতিন মুহাম্মদ-এর জয় নিশ্চিত করেছে যে গ্রামীণ ও সংখ্যালঘু প্রধান অঞ্চলে তৃণমূলের উন্নয়নমূলক প্রচার এখনো কার্যকর। ভোট প্রচারে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিলেন হুমায়ুন কবির। নওদা ও রেজিনগর উভয় কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে হুমায়ুন কবীরের জয়লাভ করাটা আম জনতা উন্নয়ন পার্টি শিবিরের জন্য এক বড় প্রাপ্তি বলে মনে করছেন অনুগামীরা।
২০২৬-এর এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলার রাজনীতিতে একক শক্তির আধিপত্য থাকলেও জনপ্রিয় সংখ্যালঘু কিছু জননেতার নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক আজও অটুট। ডোমকলের বাম প্রার্থী বা ভাঙড়ের আইএসএফ প্রার্থী নওসাদ সিদ্দিকী, তাঁরা অন্যদলের হলেও রাজনৈতিক আদর্শের মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিধানসভায় উপস্থিত থাকবেন।
বিজেপির এই বিপুল সাফল্যের মধ্যে থেকেও বাম-কংগ্রেস ও ছোট দলগুলোর এই জয় আগামী দিনে বাংলার বহুমাত্রিক রাজনীতির নতুন কোনো মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটুকু বলা যেতেই পারে, ডোমকলে ওড়া লাল ঝান্ডা বাম শিবিরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।