শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
আজ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রিয় গদ্যশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিন। তাঁকে শুধু একজন লেখক বললে হয়তো তাঁর ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখা হয়। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর যে কজন লেখক সত্যিকার অর্থে দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে বিশ্বকে নিজের করে নিয়েছিলেন, সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁদের অন্যতম। তাঁর লেখায় যেমন ছিল পৃথিবী দেখার বিস্ময়, তেমনই ছিল বাঙালির জীবন, রসবোধ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানুষের প্রতি গভীর মমতা।
‘দেশে বিদেশে’ কিংবা ‘চাচা কাহিনী’—এই বইগুলির পাতায় পাতায় যে মানুষটিকে পাওয়া যায়, তিনি একই সঙ্গে বিদগ্ধ, রসিক, তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং আশ্চর্য মানবিক। তাঁর কলমে বিদেশ কখনও শুধুই বিদেশ নয়, আর ধর্ম কখনও মানুষের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর নয়। বরং পৃথিবীকে দেখার তাঁর চোখে মানুষই ছিল শেষ কথা।
তাঁকে ঘিরে ছড়িয়ে থাকা নানা গল্পের মধ্যে একটি আজও বিশেষভাবে মনে থেকে যায়। গল্পটি সত্যি কি না, তার ঐতিহাসিক প্রমাণ হয়তো নেই; কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর স্বভাব ও মানসিকতার সঙ্গে এতটাই মানানসই যে গল্পটি তাঁরই হয়ে উঠেছে।একবার কোনও এক আমন্ত্রণে কোথাও বেড়াতে গিয়ে গঙ্গার ধারে একটি আসনে চুপচাপ বসেছিলেন আলী সাহেব। পরনে তাঁর পরিচিত ধবধবে সাদা ধুতি। সেদিন ছিলঞ সরস্বতী পুজো। এমন সময় লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে এক বৃদ্ধা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে।
বৃদ্ধার চোখে তিনি তখন যেন একজন পুরোহিত। হয়তো তাঁর পোশাক, শান্ত মুখ আর গম্ভীর উপস্থিতি দেখে বৃদ্ধার মনে হয়েছিল—এই মানুষটিই নিশ্চয় পুজো করে দিতে পারবেন।বৃদ্ধা অনুরোধ করলেন, “বাবা, আমার বাড়িতে এসে সরস্বতী পুজোটা সেরে দিয়ে যাও না। এত বেলা হয়ে গেল, পুরুতমশায় এখনও আসছেন না। নাতনীটা না খেয়ে বসে আছে।”কী করেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী?হেসে বিষয়টি এড়িয়ে যাননি। নিজের পরিচয়ও বোঝাতে যাননি। বরং বৃদ্ধার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর গিয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে।
আর সেখানেই যেন গল্পটি হয়ে ওঠে কিংবদন্তি।যে মানুষটি মুসলমান পরিবারে জন্মেছিলেন, তিনিই সেদিন শুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণে সরস্বতী পুজো সম্পন্ন করেছিলেন—এমনটাই প্রচলিত সেই কাহিনিতে। পুজো শেষে পুরোহিতের প্রাপ্য ‘সিধা’ বা গুরুদক্ষিণা নিয়েই নাকি তিনি সেখান থেকে চলে এসেছিলেন।
ঘটনাটির সৌন্দর্য এখানেই—তিনি কোনও ধর্মকে জয় করতে যাননি, কাউকে নিজের ধর্মে টানতেও যাননি। তিনি শুধু একজন বৃদ্ধার অসহায় অনুরোধের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কাছে ধর্মের পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রয়োজন বড় হয়ে উঠেছিল।সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যেও বারবার ফিরে আসে এই মানবিক দৃষ্টি। বহু দেশ ঘুরেছেন, বহু ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, নানা ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। তাই তাঁর পৃথিবী ছিল সংকীর্ণ পরিচয়ের পৃথিবী নয়। তিনি ছিলেন এমন এক বাঙালি, যিনি বাঙালিত্বকে ভালোবেসেও নিজেকে পৃথিবীর বৃহত্তর মানবসমাজ থেকে আলাদা করেননি।
তাঁর রসবোধ ছিল তীক্ষ্ণ, কিন্তু কখনও নিষ্ঠুর নয়। তাঁর বিদ্যা ছিল গভীর, কিন্তু আত্মম্ভরী নয়। আর তাঁর ধর্মবোধ ছিল এমন, যেখানে মানুষের প্রতি ভালোবাসাই শেষ সত্য।আজ তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু ‘দেশে বিদেশে’-র লেখককে মনে করার দিন নয়। মনে করার দিন সেই মানুষটিকেও, যিনি প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের পরিচয়ের দেওয়াল সরিয়ে রেখে এক বৃদ্ধার নাতনির মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য সরস্বতীর সামনে বসতে পেরেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সাহিত্য বদলায়, সমাজ বদলায়, মানুষের পোশাক বদলায়। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই সহজ শিক্ষা বদলায় না।
সৈয়দ মুজতবা আলী তাই শুধু বাংলা গদ্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নন—তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞান মানুষকে বড় করে, কিন্তু মানবিকতাই তাকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলে।