এখানে হিন্দু-মুসলিমের ভেদাভেদ নেই! মা কালীর পুজোয় মেতে ওঠে সবাই, মাজারেও পড়ে সিন্নি, ২০০ বছর ধরে সম্প্রীতির আলো দেখা যায় পতিরামে
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
ধর্মের পরিচয় আলাদা, আলাদা রয়েছে উপাসনার রীতি, কিন্তু বিশ্বাসের বন্ধনে কোথাও যেন কোনও বিভেদ নেই। একদিকে মন্দিরে চলে দেবী চামুণ্ডার আরাধনা আর অন্যদিকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে মাজারে সিন্নি নিবেদন করেন মুসলিমরা। এমনই এক অসাধারণ সম্প্রীতির ছবি বছরের পর বছর ধরে তুলে ধরে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট ব্লকের পতিরামের পোদ্দারপাড়ার বুড়ি মা কালীর পুজো।
প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন এই কালিপুজো হয়ে উঠেছে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।স্থানীয় স্তরে শোনা যায়, পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশের কাহিনি। স্থানীয়রা জানালেন, প্রায় ২০০ বছর আগে পোদ্দারপাড়ার কৃষ্ণলাল পোদ্দার স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ পেয়েছিলেন। স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন, পতিরামের কাছে ইছামতি নদীর জলে ভেসে আসবে দেবীর মুখোশ। সেই মুখোশ উদ্ধার করে এনে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরদিনই নাকি কৃষ্ণলাল পোদ্দার নদীতে গিয়ে দেবীর মুখোশ উদ্ধার করেন। এরপর স্বপ্নাদেশ মতো মন্দির প্রতিষ্ঠা করে শুরু হয় সেই দেবীর আরাধনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক পুজোই এলাকার মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে বুড়ি মা কালীর পুজো হিসেবে।
তবে এই পুজোর মাহাত্ম্য যেমন রয়েছে তেমনি এই পুজোকে ঘিরে উঠে এসেছে সম্প্রীতি ছবিটা। এর সবচেয়ে বড় পরিচয়, ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মিলন ঘটানো। মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি মাজার। একদিকে মন্দিরে দেবীর পুজো হয়, তখন অন্যদিকে মাজারে সিন্নি নিবেদন করেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই রীতি। একই চত্বরে দুই ধর্মের মানুষের এমন সহাবস্থানই বুড়ি মা কালীর পুজোকে দিয়েছে এক অন্য মাত্রা। এখানে কারও বিশ্বাসকে ছোট করে দেখার জায়গা নেই।
প্রত্যেকেই নিজের ধর্মীয় রীতি মেনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অথচ পাশাপাশি অবস্থান করছে দুই উপাসনাস্থল। এখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যই এই ঐতিহ্যের মূল শক্তি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি বহন করে চলেছেন এলাকার মানুষ। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি পর্ব। জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় সোমবার মায়ের মনসা পুজো ঘিরে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। পাশাপাশি কালীপুজোর দিনও নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করা হয়। বছরের পর বছর ধরে পোদ্দার পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
কালিপুজো হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
পুজোর ইতিহাস প্রসঙ্গে পোদ্দার পরিবারের বংশধর রাহুল পোদ্দার জানান, তাঁর ঠাকুরদার কাকা কৃষ্ণলাল পোদ্দারই স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীর মুখোশ উদ্ধার করেছিলেন। সেই উদ্ধার করা মুর্তি পুজো করতেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর কথায়, মন্দিরের পাশের মাজারে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন সিন্নি নিবেদন করেন। দীর্ঘদিন ধরেই এই রীতি চলে আসছে। এখানে ভেদাভেদের বিষয়কে সরিয়ে রেখে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর মাজারের সিন্নি নিবেদনের রীতি পাশাপাশি বয়ে নিয়ে চলেছে সম্প্রীতির সুর। বলা যেতে পারে, প্রায় দুশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে বুড়ি মা কালীর পুজো আজও সাক্ষী হয়ে রয়েছে এক সুন্দর সামাজিক ঐতিহ্যের।
সময় বদলেছে প্রজন্ম বদলেছে কিন্তু বদলায়নি মানুষের সহাবস্থানের এই পরম্পরা। কালিপুজোকে ঘিরে পতিরামের এই ছোট্ট চত্বর যেন হয়ে যায় সম্প্রীতির এক জীবন্ত ঠিকানা। আর বার্তা দেয়, ধর্মের পথ আলাদা হতে পারে কিন্তু মানুষের হৃদয়ের পথ এক।