ক্যামেরার আড়ালের প্রতিভা: বিবিসির ২০২৬ সালের ৯টি সেরা ছবির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে হাফিজ আহমেদের ছবি

Story by  Ariful Islam | Posted by  Aparna Das • 9 h ago
হাফিজ আহমেদ
হাফিজ আহমেদ
 
আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি

আমরা প্রায়ই টেলিভিশনের পর্দা বা মোবাইলের স্ক্রিনে বিভিন্ন প্রতিভার ঝলক দেখি এবং সেগুলোর প্রশংসা করি। কিন্তু সেই প্রতিভাগুলোকে ক্যামেরায় ধারণ করে যাঁরা পেছনে থেকে কাজ করে যান, সেই ক্যামেরার আড়ালের মানুষগুলিও যে সমানভাবে দক্ষ ও প্রতিভাবান, তা প্রমাণ করেছেন ফটো সাংবাদিক হাফিজ আহমেদ। সম্প্রতি তাঁর তোলা একটি আলোকচিত্র আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (BBC) ২০২৬ সালের সেরা ৯টি ছবির যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে তাঁর তোলা সেই বিশেষ ছবি। সাধারণত আমরা টেলিভিশন বা মোবাইলের পর্দায় নানা প্রতিভার পরিচয় পাই, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করা মানুষেরাও যে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, হাফিজ আহমেদের এই সাফল্য তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
 
এই বিশেষ ছবিটি তিনি চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি তুলেছিলেন। ১৭ জানুয়ারি গুয়াহাটির সরুসজাইয়ে অবস্থিত অর্জুন ভোগেশ্বর বরুয়া ক্রীড়া প্রকল্পে বাগরুম্বা নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন নৃত্যশিল্পীরা। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম অন্তর্ভুক্ত করে নতুন রেকর্ড গড়ার লক্ষ্যেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের আগের দিন চূড়ান্ত মহড়ার সময় ছবিটি তোলা হয়।
 
BBC-এর শীর্ষ ৯টি ছবির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা হাফিজ আহমেদের ছবিটি
 
‘আওয়াজ – দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ফটো সাংবাদিক হাফিজ আহমেদ বলেন, “ছবিটি আমি ফাইনাল রিহার্সালের দিন তুলেছিলাম। আর অন্য ছবিগুলোর মতোই এটি এজেন্সিতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ছবিটি তোলার সময় আমি একেবারেই ভাবিনি যে এমন কিছু হবে। নৃত্যশিল্পীরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিভিন্ন প্যাটার্নে বাগরুম্বা নৃত্য পরিবেশন করছিলেন। আমি সেই মুহূর্তগুলো যত্ন করে ক্যামেরাবন্দি করছিলাম। তখন এমন কোনও স্বীকৃতি পাব বলে একেবারেই ভাবিনি। স্বীকৃতি পাওয়ার পরেই জানতে পারি, বিমূর্ত শিল্পী পিয়েত মন্ড্রিয়ানের শিল্পকর্মের সঙ্গে আমার তোলা ছবিটির মিল রয়েছে। তখনই উপলব্ধি করি, সম্ভবত সেই কারণেই এই স্বীকৃতি অর্জন করতে পেরেছি।”
 
গুয়াহাটির সরুসজাইস্থিত অর্জুন ভোগেশ্বর বরুয়া ক্রীড়া প্রকল্পের স্টেডিয়ামের গ্যালারির ওপর থেকে ছবিটি তুলেছিলেন হাফিজ আহমেদ। তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার একটি ফটো এজেন্সি জুমা প্রেস (Zuma Press)-এর জন্য কাজ করছি। অন্য ছবির মতোই জানুয়ারি মাসে এই ছবিটিও তাদের পাঠিয়েছিলাম। যতদূর জেনেছি, BBC বিভিন্ন এজেন্সি থেকে এই ছবিগুলি সংগ্রহ করেছে।”
 
হাফিজ আহমেদের ক্যামেরাবন্দি দৃশ্য
 
উল্লেখ্য, হাফিজ আহমেদের এই সাফল্যে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কার্যালয় থেকেও তাঁকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। হাফিজ বলেন, “আমি আমাদের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। কারণ তিনি অত্যন্ত সুন্দর একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অসমীয়া সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলেই বিহু, ঝুমুর ও বাগরুম্বা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পরিচিতি লাভ করেছে। আমরাও এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বাইরে কোথাও হলে হয়তো এই ছবিটি তোলার সুযোগ পেতাম না। বাগরুম্বা নৃত্য পরিবেশনের সময় দৃশ্যটি এতটাই সুন্দর ছিল যে ভাষায় তা বোঝানো সম্ভব নয়। এজন্য আমি অসম সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।”
 
উল্লেখ্য, হাফিজ আহমেদ ২০১২ সালে ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত হন। নিউজ ফটোগ্রাফির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। সেই কারণে তিনি ‘দ্য সেন্টিনেল’-এ যোগ দিয়ে ফটো সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার শুরু করেন। বর্তমানে তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক এজেন্সির সঙ্গে ফ্রিল্যান্স কনট্রিবিউটর হিসেবে চুক্তিবদ্ধ রয়েছেন। নিয়মিতভাবে তিনি সেই এজেন্সিগুলিতে ছবি পাঠিয়ে থাকেন। আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলির মধ্যে রয়েছে জুমা প্রেস, রয়টার্স এবং আনাদোলু। এছাড়াও, তিনি জাতীয় সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার জন্য গুয়াহাটি থেকে নিয়মিত ছবি পাঠান।
 
হাফিজ আহমেদের ক্যামেরাবন্দি দৃশ্য
 
ফটোগ্রাফির ক্যারিয়ারে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে হাফিজ আহমেদ বলেন, “বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমি যেহেতু নিউজ ফটোগ্রাফি করি, তাই ভালো সময়ের অপেক্ষায় বসে থাকার সুযোগ নেই। হঠাৎ করেই ছবি তুলতে হয়। ব্রেকিং নিউজের ক্ষেত্রে আমাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়। বিশেষ করে আন্দোলন, বন্যা বা যেকোনও দুর্ঘটনার সময় অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে, কিন্তু আমাদের প্রস্তুত থাকতেই হয়।”
 
উল্লেখ্য, নিজের প্রিয় কাজের মাধ্যমে হাফিজ আহমেদ বিভিন্ন সম্মান ও পুরস্কার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সম্প্রতি গুয়াহাটির দিসপুর প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। হাফিজ বলেন, “আসলে আমি সম্মান বা পুরস্কারের জন্য কাজ করি না। আমি আমার কাজকে ভালোবাসি এবং সবসময় ভালো ছবি তোলার চেষ্টা করি। BBC-র এই স্বীকৃতি আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। এ ধরনের স্বীকৃতি ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার প্রেরণা দেয়।”
 

এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমেরিকার সেই সংবাদ সংস্থার কর্তৃপক্ষও তাঁকে প্রশংসা ও শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিয়েছেন। অসমের একজন ফটো সাংবাদিকের এই কৃতিত্ব গোটা অসমবাসীকেও গর্বিত করেছে। পাশাপাশি, এই ছবির মাধ্যমে বাগরুম্বা নৃত্য বিশ্বজুড়ে নতুন পরিচিতি লাভ করেছে। ছবিটির সঙ্গে BBC লিখেছে, “ভারতের অসমের গুয়াহাটির সরুসজাই স্টেডিয়ামে জানুয়ারি মাসে বড়ো জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম বাগরুম্বা নৃত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ার চেষ্টা চলছিল। সেই সময় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত বাগরুম্বা নৃত্যশিল্পীদের প্রস্তুতির মুহূর্ত ওপর থেকে তোলা এক অসাধারণ ছবিতে অংশগ্রহণকারীদের শরীরগুলো যেন একটানা চলমান রঙিন নকশার মতো ঝাপসা হয়ে উঠেছিল।”
 
হাফিজ আহমেদের বাড়ি গোলাঘাটের বেঙেনাখোৱায়। ২০১২ সালে তিনি লালমাটিতে অবস্থিত আইআইই (IIE) থেকে ফটোগ্রাফি বিষয়ক একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি তিনি কৃষ্ণকান্ত সন্দিকৈ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর থেকেই তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলোকচিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংবাদসেবা প্রদান করে আসছেন। তাঁর তোলা বহু ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
 
হাফিজ আহমেদের ক্যামেরাবন্দি দৃশ্য
 
র্যাট-হোল মাইনিংয়ের সময় হাফিজের তোলা একটি আলোকচিত্র বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। এটি তাঁর নিজেরও অন্যতম প্রিয় ছবি। বর্তমানে গুয়াহাটির বাসিন্দা হাফিজের কাছে ফটোগ্রাফি যেমন তাঁর নেশা, তেমনি পেশাও। নীরবে নিজের কাজে মনোনিবেশ করা হাফিজের মতে, একটি ছবির মাধ্যমেও গোটা বিশ্বের কাছে একটি খবর পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।


শেহতীয়া খবৰ