ভক্তি চালক
সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের পুনে শহরের এক তরুণ মুসলিম মহিলা তানুজা মোহসিন সান্দে একটি প্রচলিত ধারণার মোকাবিলা করছেন—যে মহারাষ্ট্রের মুসলমানরা নাকি মারাঠি ভাষায় কথা বলেন না। অনলাইনে পোস্ট করা তার ভিডিওগুলোর মাধ্যমে তানুজা এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছেন।
তার ভিডিওগুলোতে হিজাব পরিহিত তানুজাকে সাবলীল মারাঠি ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, “অনেকেই মনে করেন মুসলিমরা মারাঠি ভাষায় কথা বলেন না। কিন্তু আমি তাদের বলতে চাই, আমি একজন মহারাষ্ট্রীয় মুসলিম এবং এই মাটিতেই আমার জন্ম। তাই নিজের ভাষার প্রতি গর্ব থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার ভিডিওগুলো শুধু মারাঠিতেই তৈরি করব। আর আমার ভিডিও দেখেন এমন দর্শকদের বেশিরভাগই মারাঠি ভাষাভাষী।”
তার এই কথনভঙ্গি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়তা থেকেই জন্ম নিয়েছে তার বিশেষ উদ্যোগ—‘রমজান ঈদ চা ডাব্বা’ (রমজান ঈদের লাঞ্চবক্স)।
টিভির খবর ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও দেখে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই শত্রুতা রয়েছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে একটু নজর দিলে দেখা যায়, বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। নিজের এই উদ্যোগের মাধ্যমে তানুজা সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন।
তানুজার শৈশব কেটেছে মুম্বাইয়ের দাদর হিন্দমাতা এলাকার পুলিশ লাইনে। তার বাবা রশিদ শেখ মুম্বাই পুলিশে সহকারী সাব-ইনস্পেক্টর (ASI) ছিলেন।
তানুজা মোহসিন সান্দে (শিশুকে কোলে নিয়ে) তার পরিবারের সঙ্গে
পুলিশ লাইনে শৈশব কাটানোর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ধর্মের নামে তিনি কখনো কোনো বৈষম্যের শিকার হননি। যদিও পুরো কলোনিতে তাদের বাড়িটিই ছিল একমাত্র মুসলিম পরিবার, তবুও তিনি হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে হোলি, দই হান্ডি এবং শিমগা (হোলির একটি রূপ)সহ সব উৎসব একসঙ্গে উদযাপন করেছেন।
আজও পুনেতে বসবাস করেও তিনি এই ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন। তার আবাসনে জৈন, মারোয়াড়ি এবং বহু হিন্দু পরিবার বাস করে। দীপাবলির দিনে লক্ষ্মী পূজার পর প্রথম ফারালের (দীপাবলির মিষ্টি-নোনতা খাবার) থালা তার বাড়িতেই পাঠানো হয়।
একইভাবে, ঈদের দিনে তানুজা নিজেই পরিবারের খাওয়ার আগে প্রতিবেশীদের কাছে ৩০-৩৫টি লাঞ্চবক্স পৌঁছে দেন। এ বছর ‘রমজান ঈদ চা ডাব্বা’ উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি এই খাবার বিতরণের একটি ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন।
সেই ভিডিওতে তিনি উল্লেখ করেন যে তিনি তার হিন্দু প্রতিবেশীদের ঈদের লাঞ্চবক্স দিচ্ছেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি বার্তাও দেন।
তানুজা মোহসিন তার স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে
এরপর তানুজা সান্দে তার ‘রমজান ঈদ চা ডাব্বা’ উদ্যোগের ধারণা ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, “ধর্মের নামে রাজনীতি মানুষকে এমনটা ভাবতে বাধ্য করে যে হিন্দু-মুসলমান মানেই যেন শত্রুতা। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই নয়। আমরা আজও একসঙ্গেই আছি। আমি যখন হিন্দু উৎসবে অংশ নিই, কেউ আমাকে কখনো বাইরের মানুষ বলে মনে করে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখানো হয়, তা সব সত্য নয়; বাস্তবে আমাদের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন।”
তিনি আরও বলেন, “রমজানের লাঞ্চবক্স দেওয়ার সময় কারও উপর আমিষ খাবার খাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। যারা নিরামিষ চান, তাদের আমি ভালোবেসে শির খুরমা দিই। আসলে আমাদের প্রতিবেশীরা শির খুরমার জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন।
‘এটা কীভাবে বানালেন? কী কী উপকরণ দিয়েছেন?’—এভাবে তারা রেসিপি জানতে চান। আর এই রেসিপি ভাগ করে নেওয়া এবং মিষ্টতা ছড়ানোর যে আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
প্রতিবেশীদের জন্য খাবার প্যাক করছেন তানুজা মোহসিন
ঈদের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটি পোস্ট করার পর তিনি ৯৯% ইতিবাচক সাড়া পেলেও ১% মানুষ নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। এতে তিনি কিছু সময়ের জন্য মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন। এমনকি তিনি মন্তব্য বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া বা ভিডিওটি মুছে ফেলার কথাও ভেবেছিলেন।
তিনি বলেন, “যখন আমি কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে দিয়েছিলাম, তখন মানুষ আমাকে মেসেজ করতে শুরু করে। তারা অনুরোধ করছিল—‘দিদি, আপনার ভিডিও খুব ভালো, আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই, দয়া করে কমেন্ট চালু করুন।’” এরপর তানুজা নেতিবাচকতাকে উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তার কমেন্ট সেকশনে অনেকেই তাদের ছোটবেলার হিন্দু-মুসলিম বন্ধুত্বের স্মৃতিও শেয়ার করেন।
রমজান মাসে তানুজা একটি ভিডিও সিরিজ শুরু করেন। মজার বিষয় হলো, তাদের বাড়ির সাহায্যকারীর করা কিছু সাধারণ প্রশ্ন থেকেই এই কনটেন্ট তৈরির ধারণা আসে।
তিনি বলেন, “আমার তিন বছরের একটি ছেলে আছে। আমি যখন পুরো রমজান মাস রোজা রাখি, তখন আমাদের সাহায্যকারী আমাকে অনেক প্রশ্ন করে। সে যেহেতু হিন্দু, তাই তার এই কৌতূহল স্বাভাবিক। সে জানতে চাইত, আমি কীভাবে রোজা রেখে বাচ্চার দেখাশোনা করি।
‘আপনি কি সারাদিন না খেয়ে থাকেন? জল না খেয়ে কীভাবে রোজা রাখেন? চাঁদ দেখার পরই কি রোজা ভাঙেন?’তার এই সহজ-সরল প্রশ্নগুলো থেকেই এই সিরিজ তৈরির ধারণা আসে।”
তিনি এই পুরো সিরিজটি মারাঠি ভাষায় তৈরি করেন এবং মানুষ এতে দারুণ সাড়া দেয়।
তানুজা একজন ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক এবং তিনি ৫ বছর আইটি সেক্টরে কাজ করেছেন। লকডাউনের সময় তার বিয়ে হয়। বর্তমানে তিনি পুনেতে তার আইটি ইঞ্জিনিয়ার স্বামী মহসিন সান্দে এবং তাদের ৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন।
তার ভাইও একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। বাড়িতে বসে কিছু আলাদা করার জন্য তিনিই তানুজাকে অনুপ্রাণিত করেন। তার পরিবারও কনটেন্ট তৈরিতে তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। তানুজার কথায়, তার ভিডিওতে প্রথম লাইক ও মন্তব্য সবসময় তার বাবার কাছ থেকেই আসে।
তরুণদের উদ্দেশ্যে তানুজা সান্দের বার্তা: “রাজনীতি শুধু অনলাইনেই থাকুক। টিভির রাজনীতি আলাদা, আর আমাদের বাস্তব জীবন আলাদা। মহারাষ্ট্রে শুরু থেকেই ধর্মের মধ্যে সমতা ছিল, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমার বাবা আমাকে এই মূল্যবোধে বড় করেছেন, আমিও আমার ছেলেকে একইভাবে বড় করব।”
তিনি আরও বলেন, “সংকটের সময় কেউ দেখে না কে কাকে সাহায্য করছে। সব ধর্মকে সম্মান করা মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতি, আর আমাদের সেটাই রক্ষা করতে হবে।”