নিউইয়র্ক:
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের একটি “পথ” রয়েছে। তিনি জানান, মস্কো থেকে দিল্লির তেল কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে “হ্রাস পেয়েছে”।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যার মধ্যে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ২৫ শতাংশ শুল্ক অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।শুক্রবার পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট ভারতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে “সফলতা” হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, “রাশিয়ার তেল কেনার জন্য আমরা ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছি। এর ফলে ভারতীয় রিফাইনারিগুলোর রাশিয়ার তেল কেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং এটি একটি সাফল্য। শুল্ক এখনও বহাল আছে। রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক এখনও কার্যকর।”তিনি আরও যোগ করেন, “আমি মনে করি, এগুলো তুলে নেওয়ার একটি পথ আছে। তাই এটিকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।”
ইউরোপ রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ না করায় বেসেন্ট ইউরোপের সমালোচনা করেন।তিনি বলেন, “আমাদের নৈতিকতার বুলি আওড়ানো ইউরোপীয় মিত্ররা এটি করতে অস্বীকার করেছে, কারণ তারা ভারতের সঙ্গে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি করতে চেয়েছিল।”
বেসেন্ট অভিযোগ করেন, ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর ভারত রাশিয়া থেকে আরও বেশি তেল আমদানি ও পরিশোধন করেছে।তিনি বলেন, “ইউক্রেন আক্রমণের আগে ভারতের রিফাইনারিতে ব্যবহৃত তেলের মাত্র ২ বা ৩ শতাংশ রাশিয়া থেকে আসত। পরে সেই তেল নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে গভীর ছাড়ে পাওয়া যায় এবং তা ১৭, ১৮, ১৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে রিফাইনারিগুলো বিপুল মুনাফা করেছে।”
তিনি ইউরোপকে ভারতের রিফাইনারিতে পরিশোধিত রাশিয়ার তেল কিনে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থ জোগানোর অভিযোগও করেন।তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ এবং বোকামির কাজ হলো—কে এই রাশিয়ান তেল থেকে তৈরি পরিশোধিত পণ্য কিনছিল? ইউরোপীয়রা। তারা কার্যত নিজেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধের অর্থ জোগাচ্ছে।”
ইউরোপীয়দের ‘বোকা’ বলেছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, “আমি বলেছি, এটি বোকামির একটি কাজ।”ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) শিগগিরই একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ভারত “অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য” বলে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি নীতি সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত।সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA)-এর তথ্য অনুযায়ী, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলো রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ায় ডিসেম্বর মাসে ভারত রাশিয়ান জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রেতাদের তালিকায় তৃতীয় স্থানে নেমে আসে।
অন্য একটি প্রসঙ্গে বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।তিনি বলেন, “মুক্ত বাণিজ্য মানেই ন্যায্য বাণিজ্য নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহু দশক ধরে এ কথা বলে আসছেন এবং ক্ষমতায় ফিরে এটিকে তার অন্যতম প্রধান নীতিতে পরিণত করেছেন।”
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ ফিরে আসছে।“আমরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্ক আয় পাচ্ছি। পাশাপাশি কারখানা ও উৎপাদন খাত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। মূলত এটি ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের বিষয়—বিশ্ব বাণিজ্যের ভারসাম্য,” তিনি বলেন।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) বৈঠকের আগে ও চলাকালীন সময়ে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে “হিস্টিরিয়ার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল”, যা মূলত ইউরোপীয় পক্ষ ও গণমাধ্যম দ্বারা উসকে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “ওই সময় কিছু দেশ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করেছিল। এতে কিছু নেতার আসল চেহারা বেরিয়ে এসেছে। আবার কেউ কেউ সংযত ছিলেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন।”বেসেন্ট জানান, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি ভালো বৈঠক করেছেন এবং এমন একটি কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, যার ওপর কাজ করতে প্রেসিডেন্ট আগ্রহী।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে “ভালো ভারসাম্য” রয়েছে।তিনি বলেন, “আমরা একটি ভালো সমীকরণে পৌঁছেছি। এ বছর নেতারা চারবার পর্যন্ত বৈঠক করতে পারেন।”
তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ককে “খুবই ভালো” বলে বর্ণনা করেন।তিনি বলেন, “নেতারা যখন সামগ্রিক সম্পর্কের সুর ঠিক করে দেন, তখন ছোটখাটো সমস্যা হলেও ফোনে কথা বলে দ্রুত তা প্রশমিত করা যায়।”
বেসেন্ট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এপ্রিল মাসে বেইজিং সফর করবেন এবং শি জিনপিং সম্ভবত গ্রীষ্মকালে ওয়াশিংটন ডিসি বা মার-এ-লাগো সফর করবেন। এছাড়া, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য জি২০ সম্মেলনেও শি অংশ নেবেন।তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (APEC) সম্মেলনে যোগ দিতে আগ্রহী, যা শেনঝেনে অনুষ্ঠিত হবে।
“চীনের সঙ্গে আমাদের একটি বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। চীন তাদের অংশ বাস্তবায়ন করেছে, আমরাও করেছি। আমাদের কারিগরি দলগুলো প্রতি সপ্তাহে যোগাযোগ রাখছে এবং বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে,” বলেন বেসেন্ট।