ঢাকা ঃ
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত ১৬ মাসে সারা দেশে অন্তত ১১৩টি মাজার, দরগাহ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টার ও মাকাম ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে। দুই বিভাগ মিলিয়ে ৬৪টি হামলার প্রমাণ মিলেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে।
মাকামের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগের ৯ জেলায় ৩৭টি মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে পাঁচ জেলায় ২৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হামলার পেছনে ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। মাজারকে ‘শিরক-বেদাত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে সরকারের হিসাবে চিত্রটি তুলনামূলক কম। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং গত বছরের ১৮ জানুয়ারি জানায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী সাড়ে পাঁচ মাসে সারা দেশে ৪০টি মাজার ও সুফি সমাধিস্থলে ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ভাঙচুর, ভক্তদের ওপর হামলা, লুটপাট ও আগুন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, সব ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মাজারে হামলার ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার শরিফে হামলা চালিয়ে কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলাকারীরা ঘটনাটিকে শরিয়তবিরোধী দাবি করে দরবার ও বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ওই ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার পর থেকে নুরুল হকের পরিবার ও ভক্তরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন দরবার-সংশ্লিষ্টরা।

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, “আমি যা বলি সেটাই ঠিক, অন্য সব ভুল এই ধারণাই ফ্যাসিজম। কেউ মাজার, গান-বাজনা নিষিদ্ধ বলছে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যার কথা বলছে। এরা আসলে ইসলামবিরোধী। এ দেশে ইসলাম এসেছে পীর-আউলিয়াদের মাধ্যমে। এই বৈচিত্র্যই ইসলামের শক্তি।” তাঁর মতে, সরকার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিশৃঙ্খলাকারীদের শক্ত হাতে দমন করা হয়নি।
মাকামের গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগের ৮০ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৯০ শতাংশ ঘটনায় প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। অধিকাংশ হামলার পর মামলা হয়নি, গ্রেপ্তার বা তদন্তেও অগ্রগতি দেখা যায়নি। গবেষকদের মতে, এই নিষ্ক্রিয়তা হামলাকারীদের উৎসাহিত করেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে এবং অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিভাগে নরসিংদীতে ১১টি, ঢাকায় ৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৫টি এবং কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর, গাজীপুর, রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইলে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নারীসহ অন্তত ১৮০ জন আহত এবং দুজন নিহত হয়েছেন। মাকামের তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ শতাংশ হামলার পেছনে ধর্মীয় মতাদর্শগত কারণ, ১৫ শতাংশ সামাজিক অসন্তোষ এবং ২০ শতাংশ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছে।
হামলার পর অন্তত ১৮টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং ১৫টির বার্ষিক ওরস বন্ধ হয়ে গেছে। মাজার-সংশ্লিষ্ট চারটি মসজিদেও হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেও হামলা হয়েছে। ৭৫ শতাংশ ঘটনায় ‘তৌহিদী জনতা’র নেতৃত্বের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখানেও অধিকাংশ ঘটনায় মামলা বা গ্রেপ্তারের অগ্রগতি নেই। হামলার পর ১২টি মাজার পরিত্যক্ত এবং ১৫টির ওরস বন্ধ রয়েছে।
রাসা সেন্টার ৫১০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে হাইকোর্টে রিট করেছে। রিটের শুনানি এ সপ্তাহেই হওয়ার কথা। গত ৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহে মাজার পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, পীর-আউলিয়ার হাত ধরেই এ দেশে ইসলাম এসেছে। মাজারে হামলা নিন্দনীয় এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
তবে একই দিনে রাজধানীর শাহ খাজা শরফুদ্দিন চিশতীর মাজারে ওরস অনুষ্ঠানে বাধা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, মাজার, মসজিদ, কবর ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর হামলা বিচ্ছিন্ন নয়। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে এসব সহিংসতা চলছে। তাঁর মতে, সরকারের অনিচ্ছা ও জবাবদিহির অভাবই এই সহিংসতা অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, মাজার-দরবারকে শরিয়তসম্মত না মনে করলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে তারা নন। এ ধরনের হামলা ইসলাম সমর্থন করে না।
গবেষণা প্রতিবেদনগুলো বলছে, প্রশাসনিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে শুরু হওয়া এই হামলার ধারাবাহিকতা এখন দেশের সুফি ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সহাবস্থানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।