হিন্দুদের জমিতে মুসলিমদের বিশ্ব ইজতেমা সম্প্রীতির অটুট বন্ধনের নজির গড়ল পশ্চিমবঙ্গ
দেবকিশোর চক্রবর্তী, হুগলি
ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহাবস্থান ও মানবিক ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো পশ্চিমবঙ্গে। পুইনান-এর বিস্তীর্ণ মাঠে হিন্দুদের মালিকানাধীন জমিতে লক্ষাধিক মুসল্লির অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলো মুসলিমদের বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ—বিশ্ব ইজতেমা। এই আয়োজন ঘিরে যে সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও মানবিকতার ছবি উঠে এসেছে, তা বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
শীতের ভোরে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পুইনানের জনপদ ভোরের আজানের ধ্বনিতে যেন জেগে উঠেছিল এক নতুন স্পন্দনে। যতদূর চোখ যায়—মানুষ আর মানুষ, মুখে প্রশান্তির ছাপ, ঠোঁটে নীরব দোয়া। এই দৃশ্যই জানিয়ে দিচ্ছিল, এখানে শুরু হয়েছে এমন এক সমাবেশ, যা শুধু ইবাদতের আয়োজন নয়, বরং সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক জীবন্ত উৎসব।
প্রায় ৩৪ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এত বড় বিশ্ব ইজতেমা হওয়ায় বহু মুসল্লি আবেগে আপ্লুত। ইজতেমা ময়দানের এক পাশে বসে থাকা সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল মালেক বলেন,“যৌবনে এখানে ইজতেমা দেখেছি। এত বছর পর আবার সেই দৃশ্য—এ যেন আল্লাহর বিশেষ দয়া। আজ এখানে বসে মনে হচ্ছে, জীবন সার্থক।”
তার পাশেই বসে থাকা নাতি, কলেজপড়ুয়া রায়হান জানায়,“মোবাইল আর ব্যস্ততার দুনিয়ায় আমরা হারিয়ে যাই। এখানে এসে বুঝছি—আসল শান্তি আসে সেজদা আর মানুষের ভালোবাসা থেকে।”
এই বিশ্ব ইজতেমার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—যে বিশাল মাঠে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মালিক স্থানীয় একটি হিন্দু পরিবার। জমির অন্যতম মালিক রতন ঘোষ বলেন,
“এই জমি আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। কিন্তু এখানে যদি মানুষের কল্যাণের কথা বলা হয়, স্রষ্টার নাম নেওয়া হয়, সেখানে ধর্মের বিভেদ থাকতে পারে না। মুসলিম ভাইয়েরা এখানে ইবাদত করেছেন—এটা আমাদের কাছে সম্মানের।”
বিশ্ব ইজতেমার ছবি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইজতেমার আয়োজনের প্রস্তাব আসতেই জমির মালিক পরিবার বিনা দ্বিধায় সম্মতি দেন। শুধু জমি নয়, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানীয় জল সরবরাহ ও যাতায়াত ব্যবস্থাতেও তারা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন। ইজতেমা চলাকালীন বহু হিন্দু যুবক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জল বিতরণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত ছিলেন।ইজতেমায় অংশ নিতে আসা দক্ষিণবঙ্গের এক মুসল্লি মোহাম্মদ ইমরান আলি বলেন,“আমরা শুধু দোয়া করতে আসিনি, আমরা দেখেছি কীভাবে হিন্দু ভাইয়েরা আমাদের আপন করে নিয়েছেন। এটাই প্রকৃত ভারতীয় সংস্কৃতি।”
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্ব ইজতেমা কোনো রাজনৈতিক বা ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সমাবেশ। কমিটির এক সদস্য বলেন,
“ইজতেমার মূল শিক্ষা আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠন। ধর্মীয় শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করলেই সমাজে শান্তি আসবে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় আয়োজন সম্ভব হতো না।”ইজতেমা উপলক্ষে কয়েকদিন ধরে হুগলি ও সংলগ্ন এলাকায় বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান,“এত বড় ধর্মীয় সমাবেশ হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাই এর প্রধান কারণ।”
ইজতেমার মাঠে ঘুরলেই চোখে পড়েছে অসংখ্য মানবিক দৃশ্য—কেউ শত শত মানুষের জন্য রান্না করছেন, কেউ জল বিলাচ্ছেন, কেউ অসুস্থ মুসল্লিকে কাঁধে তুলে অস্থায়ী চিকিৎসা শিবিরে নিয়ে যাচ্ছেন। অচেনা মানুষদের মধ্যেও ছিল গভীর আপন ভাব—এই মানবিক বন্ধনই ইজতেমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
দেশের নানা প্রান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও মুসল্লিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ থেকে আসা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন,“সীমান্ত আমাদের আলাদা করতে পারে, কিন্তু ঈমান পারে না। এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমরা সবাই এক পরিবার।”
বিশ্ব ইজতেমার ছবি
চার দিনের সমাবেশের শেষ দিনে সোমবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ইজতেমার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। দেশ ও দশের মঙ্গল, সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিশ্ব শান্তির জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়। সেই মুহূর্তে ধর্ম, ভাষা ও পরিচয়ের ভেদাভেদ মুছে গিয়ে একটাই পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মানুষ।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, পুইনানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা ছিল কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হিন্দুদের জমিতে মুসলিমদের এই বৃহৎ সমাবেশ আবারও প্রমাণ করে দিল—ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা ও সহাবস্থানই সমাজের প্রকৃত ভিত্তি।