টুপির আড়ালেই লুকিয়ে রইল শোক—স্বামী উইং কম্যান্ডার নামাংশের কফিনের সামনে ভেঙে পড়লেন আফসান আখতার

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 4 d ago
টুপির আড়ালেই লুকিয়ে রইল শোক—স্বামী উইং কম্যান্ডার নামাংশের কফিনের সামনে ভেঙে পড়লেন আফসান আখতার
টুপির আড়ালেই লুকিয়ে রইল শোক—স্বামী উইং কম্যান্ডার নামাংশের কফিনের সামনে ভেঙে পড়লেন আফসান আখতার
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

টুপিটা সামান্য নিচের দিকে নামানো। যেন চোখের জল আড়াল করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা। সেই টুপির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে শোক-ভেজা, থমথমে মুখ। মেয়ের ছোট্ট হাত শক্ত করে ধরে স্বামীর কফিনের সামনে এসে দাঁড়ালেন উইং কম্যান্ডার আফসান আখতার। কফিনের ভেতরে শুয়ে আছেন তিনি—জীবনের সঙ্গী, সহযোদ্ধা এবং আকাশে উড়ার সহপাইলট উইং কম্যান্ডার নামাংশ স্যাল।

রবিবার বিকেলে হিমাচল প্রদেশের কাংড়ার পাহাড়ি গ্রামের মাটিতে পৌঁছয় নামাংশের মরদেহ। সামরিক যান থামতেই হুড়মুড় করে এগিয়ে আসে অসংখ্য মানুষ। সকলে দেখতে চায় গ্রামের সেই ছেলেকে, যিনি যুদ্ধবিমানে চেপে দেশের আকাশ রক্ষা করতেন। বাড়ির বাইরে সাজানো হয় কফিন। উপরে রাখা নামাংশের একটি হাসিমুখের ছবি—চারদিকে ফুলমালা আর ধূপকাঠির ধোঁয়া। সেদিকে তাকাতেও যেন কুণ্ঠা জন্মায়, মনে হয়, এই মানুষটিই কি আর কখনও ফিরবেন না?

দুবাইয়ের এয়ার শো-তে প্রদর্শনের সময়ে ভেঙে পড়ে যুদ্ধবিমান তেজস। সেই বিমানের পাইলট ছিলেন নামাংশ স্যাল। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শেষ মুহূর্তে ইজেক্ট করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় উড়ছিল বিমানটি। তাই সুরক্ষা-ক্যাপসুল খুলে বেরিয়ে আসার আর সময় পাননি পাইলট।

এয়ার শো শুরু হওয়ার আগে বাবা জগন নাথকে ফোনে বলেছিলেন, “ইউটিউবে দেখো, কেমন উড়ছি দেখতে পাবে।” গর্বে বুক ভরে উঠেছিল তাঁর বাবার। হয়তো প্রতিবেশীদেরও বলেছিলেন—“আমার ছেলে এয়ার শো-তে কসরত দেখাবে।” কিন্তু সেই ইউটিউব-ই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হয়ে ওঠে শোকের বার্তাবাহক। ভিডিও দেখতে দেখতেই বিমান ভেঙে পড়তে দেখেন জগন নাথ। তারপর ধীরে ধীরে সামনে আসে ভয়াবহ সত্য—ছেলে আর নেই।

নামাংশের দেহ পৌঁছতেই গ্রামজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। প্রত্যেকে একবার শেষ দেখা দেখতে ভিড় জমায়। অনেকেরই চোখে জল। “গ্রামের বীর সন্তান” বলে ডাকছিলেন তাঁরা। কেউ ফুল রাখলেন, কেউ নতমস্তকে প্রণাম জানালেন।

সবাইয়ের শেষে এগিয়ে এলেন আফসান আখতার। নিজের বায়ুসেনার নীল পোশাকে তিনি যেন আরও দৃঢ়, আরও স্থির মনে হচ্ছিলেন। কিন্তু কফিনের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই ভেঙে গেল সেই দৃঢ়তার মুখোশ। নামাংশকে স্যালুট করলেন তিনি—তারপরই বুকভাঙা কান্নায় কেঁদে উঠলেন। সেই মানুষটি তো শুধু স্বামী নন, ছিলেন তাঁর সহযোদ্ধা, আকাশে তাঁর ডানার সঙ্গী।

এক সহ-অফিসার এগিয়ে এসে আলতো করে তাঁর হাত ধরলেন। জানালেন নীরব আশ্বাস—“আমরা আছি।” কিন্তু কোনও আশ্বাসেই থামছিল না কান্না। যেন জমে থাকা যতটা শোক, সবই ভেঙে বেরিয়ে আসছিল একসঙ্গে। শেষমেশ বায়ুসেনার এক মহিলা অফিসার তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যান।

পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয় উইং কম্যান্ডার নামাংশ স্যালের শেষকৃত্য। গার্ড অব অনার, গান স্যালুট, জাতীয় পতাকার আচ্ছাদন—সবকিছুর মধ্যেই শোক আর গর্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে। যেন পাহাড়ি আকাশও সেই মুহূর্তে ভারী হয়ে আসে।

সেদিন শুধু আফসান আখতার নন, সমগ্র দেশ শোকাহত। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রত্যেকে স্যালুট জানায় এক বীর পাইলটকে—যিনি উড়তে শিখে গিয়েছিলেন এমনভাবে, যে পৃথিবীর মাটিই আর তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি।