দেবকিশোর চক্রবর্তী
দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পর অবশেষে ক্যামেরার সামনে আসতে চলেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লিগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আগামী শুক্রবার দিল্লিতে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাসভায় তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পবিত্র শুক্রবারে তাঁর এই সম্ভাব্য ক্যামেরা-উপস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
২০২৪ সালের ৫ অগস্ট বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। দেশত্যাগের পর থেকেই তিনি সরাসরি জনসমক্ষে বা গণমাধ্যমের ক্যামেরায় আসেননি। তবে ভার্চুয়াল মাধ্যমেই তিনি দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের মতো একাধিক এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে তিনি নিয়মিতভাবে আওয়ামী লিগ-এর তৃণমূল স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘দায়মুক্তি’-তেও তিনি ভার্চুয়ালি অংশ নেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কোথাও তাঁকে ক্যামেরার মুখোমুখি দেখা যায়নি।
দিল্লিতে অবস্থান করলেও গত দেড় বছরে ভারতের কোনও অনুষ্ঠানেও তিনি ভার্চুয়ালি যোগ দেননি। ফলে শুক্রবারের এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে আগ্রহ ও গুরুত্ব অনেকটাই বেড়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীদের একাংশ জোর দিয়ে চাইছেন, নেত্রী যেন এবার ক্যামেরার সামনে এসে বক্তব্য রাখেন। তাঁদের মতে, কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করতে নেত্রীর সরাসরি উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। এই প্রত্যাশার কথা শেখ হাসিনার কানে পৌঁছানো হলেও, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও তাঁর সিদ্ধান্ত জানাননি। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, ২৩ জানুয়ারি শুক্রবারই তাঁকে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে দেখা যেতে পারে।
দিল্লির এই আলোচনাসভার আয়োজক ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রেসক্লাবস। ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের দিল্লি অফিসে সন্ধ্যায় বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এই আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার কথা শেখ হাসিনার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আমন্ত্রণপত্রে উদ্যোক্তারা তাঁকে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ইতিমধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র বিলি শুরু হলেও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ঢাকার তরফে এই অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি জানানো হতে পারে। এর আগেও দিল্লিতে আওয়ামী লিগ নেতাদের একটি সাংবাদিক সম্মেলন শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছিল। পরে জানা যায়, দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের আপত্তির পরেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে আলোচনা করে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও সরকারিভাবে কোনও পক্ষই তখন বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবারের অনুষ্ঠানের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। ওই রায়ের বিষয়টি জানিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির মাটিতে কোনও অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে অনেক পর্যবেক্ষক নয়া দিল্লির তরফে তাঁর এবং আওয়ামী লিগের প্রতি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন।
শুক্রবারের আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য রাখবেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সেক্রেটারি জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার মহম্মদ এ সিদ্দিক, আওয়ামী লিগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী মহম্মদ আলি আরাফাত, একে আব্দুল মোমেন ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বক্তাদের তালিকায় রয়েছেন অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী রোকেয়া প্রাচী এবং ফ্রান্সের কোট দ্য জুর ইউনিভার্সিটির সম্মানিক ফেলো ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন ডিন অধ্যাপক এস এম মাসুম বিল্লাহ।
এদিকে বাংলাদেশে আর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে আওয়ামী লিগকে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। নির্বাচনকে অবৈধ বলে আগেই ঘোষণা করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি দলের সমর্থকদের উদ্দেশে ‘নো বোট, নো ভোট’ স্লোগান তুলে ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছেন। আওয়ামী লিগের দাবি, ব্যালটে দলের প্রতীক নৌকা না থাকলে ভোটকেন্দ্র ফাঁকাই থাকবে।
নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে দিল্লির মঞ্চ থেকে শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য ক্যামেরা-উপস্থিতি ও ভাষণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে কী বার্তা বহন করে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের।