স্কটল্যান্ড:
ব্রিটেনের মাটিতে শরতের আগমন মানেই বাঙালির মনে পুজোর ঢাক, নতুন পোশাক আর আপনজনদের সঙ্গে মিলনমেলার স্মৃতি। হাজার মাইল দূরে থেকেও সেই চেনা আবেগকে ধরে রাখতে চান প্রবাসী বাঙালিরা। তাই জাঁকজমকের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন, বাংলা সংস্কৃতির চর্চা এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দিয়েই দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্রিটেনের বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তা। ২০২৬ সালের দুর্গোৎসবেও সেই আবেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইংল্যান্ড থেকে স্কটল্যান্ডের একাধিক শহরে।
এখানে দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের যোগসূত্র তৈরিরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের কাছে পুজো মানে ফেলে আসা কলকাতা, পাড়ার আড্ডা, অঞ্জলি আর ভোগের স্মৃতি। অন্যদিকে, ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে এই উৎসব বাংলা ভাষা, গান, খাবার, শিল্প ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। সেই কারণেই পুজোর আয়োজনকে পরিবারের সব বয়সের মানুষের কাছে আনন্দময় করে তুলতে চাইছেন উদ্যোক্তারা।
ওয়ারউইকশায়ার থেকে গ্লাসগো—পুজোর আয়োজনে সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন
ইংল্যান্ডের ওয়ারউইকশায়ারে ১৬ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ওয়েস্টন-আন্ডার-ওয়েদারলির ভিলেজ হলে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছে ওয়ারউইকশায়ার সর্বজনীন পুজো কমিটি। ‘ঐক্যের আলপনা: ওয়ারলি শিল্পের মাধ্যমে ওয়ারউইক থেকে বাংলা’—এই ভাবনাকে সামনে রেখে তাদের এবারের উৎসব। পুজোর প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিশুদের জন্য শিল্প ও কারুকাজ, সৃজনশীল কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে উৎসবে যুক্ত করাই উদ্যোক্তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
নটিংহামেও পুজো ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। ২০১৮ সালে কয়েকটি বাঙালি পরিবারের উদ্যোগে শুরু হওয়া নটিংহাম বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপুজো এবারও ১৭ থেকে ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। কার্লটন রোডের হিন্দু মন্দিরে এই আয়োজন প্রবাসী বাঙালিদের কাছে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
অন্যদিকে, ম্যানচেস্টারে গ্রেটার ম্যানচেস্টার বেঙ্গলি হিন্দু কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন (জিএমবিএইচসিএ) ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত গান্ধী হলে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি বাংলা নববর্ষ, সরস্বতী পুজো ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাঙালিদের একত্রিত করে আসছে। এ বছর ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতিকে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
স্কটল্যান্ডের পেইজলিতেও ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক পরিষদ (বিএসপি) গ্লাসগো। ১৯৮১ সালে শুরু হওয়া এই পুজো আজ স্কটল্যান্ডের বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রবাসে নতুন করে বসতি গড়া পরিবার থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের বাসিন্দা—সকলের কাছে এই উৎসব মিলন ও শিকড়ের টান অনুভব করার সুযোগ।
ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে দুর্গাপুজোর আয়োজনের ধরন আলাদা হলেও আবেগের জায়গাটি এক। কোথাও ওয়ারলি শিল্পের মাধ্যমে সংস্কৃতির মেলবন্ধন, কোথাও শিশুদের সৃজনশীলতার চর্চা, আবার কোথাও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। এই আয়োজনগুলির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, প্রবাসে দুর্গাপুজো কেবল কয়েক দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের পরিচয় পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমও।
প্রথম প্রজন্মের বাঙালিদের কাছে পুজো ফিরিয়ে আনে ফেলে আসা দেশের স্মৃতি। আর ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্মের কাছে এই উৎসব বাংলা ভাষা, গান, খাবার, শিল্প ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানার সুযোগ তৈরি করে। তাই আড়ম্বরের চেয়ে আপনজনের সঙ্গে সময় কাটানো, একসঙ্গে অঞ্জলি দেওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কিংবা ভোগের আসরে মিলিত হওয়াই হয়ে উঠছে অনেক পুজোর মূল আকর্ষণ।
ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, দুর্গাপুজোর আবেগ বাঙালিকে বারবার নিজের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনে। ব্রিটেনের পুজো উদ্যোক্তাদের এই ঘরোয়া আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাই উঠে আসছে এক সহজ অথচ গভীর বার্তা—উৎসবের আসল আনন্দ শুধু আলোকসজ্জা বা জাঁকজমকে নয়, বরং একসঙ্গে থাকা, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সকলকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে।