“সর্ব ধর্ম সম্ভব”- আন্তধর্মীয় সমন্বয় সপ্তাহ ২০২৬-এ ভারতের অনুরণিত কণ্ঠ

Story by  Pallab Bhattacharyya | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
আন্তধর্মীয় অনুষ্ঠান
আন্তধর্মীয় অনুষ্ঠান
 
  পল্লব ভট্টাচার্য

বিশ্ব আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি সপ্তাহ ২০২৬ সালে ১ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিসরে পালিত হতে যাচ্ছে, এক এমন উদ্যোগ, যা দীর্ঘদিন ধরে ধর্ম ও জাতির সেতুবন্ধন রচনায় অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই ধারণাটি প্রথম উপস্থাপন করেন; পরবর্তী সময়ে একই বছরের ২০ অক্টোবর জাতিসংঘের প্রস্তাব A/65/5 এর মাধ্যমে এটি গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বিশেষভাবে বলা হয়েছিল, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আন্তধর্মীয় সংলাপ শান্তির সংস্কৃতি নির্মাণে অপরিহার্য। সেই সঙ্গে সকল বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষকে “ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা ও প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা” বা “সৎ-এর প্রতি ভালোবাসা ও প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা”, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির আলোকে এই সপ্তাহ পালন করার আহ্বান জানানো হয়। ২০১১ সালে প্রথম উদ্‌যাপনের পর থেকেই আন্দোলনটি বিশ্বজুড়ে সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের এক শক্তিশালী জাগরণে পরিণত হয়েছে।
 
দিল্লিতে ২০২৫ সালের পালন ছিল ভারতের বহুত্ববাদী সত্তার এক উজ্জ্বল প্রকাশ। গ্লোবাল পিস ফাউন্ডেশন (GPF) ইন্ডিয়া আয়োজিত তিন দিনের ইন্টারফেইথ কনক্লেভ ২০২৫, যেখানে প্রাচীন ভারতীয় চিন্তা বসুধৈব কুটুম্বকম বা “বিশ্ব এক পরিবার”, এর সঙ্গে আধুনিক শান্তিনির্মাণ ধারাকে অসাধারণভাবে যুক্ত করা হয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ ও পারসি, এই সাতটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে বিভক্ত পৃথিবীতে বিশ্বাসের ঐক্য-শক্তিকে পুনরায় উচ্চকিত করেন।
 

কনক্লেভের উদ্বোধনী সেশনে GPF ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ড. মার্কণ্ডেয় রাই ভারতের সভ্যতাগত ঐক্যের বাণী তুলে ধরেন। ভারতীয় সর্বধর্ম সংসদের আহ্বায়ক গোস্বামী সুশীলজি মহারাজ স্মরণ করিয়ে দেন ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্মসংসদে স্বামী বিবেকানন্দের অমর ভাষণকে, যা আজও মানব ঐক্যের এক অবিনাশী স্মারক। ভিক্ষু সাংঘসেনা, ফাদার রাজকুমার জোসেফ, ইমাম ফয়জান মুনির এবং স্বামী সর্বলোকানন্দ সকলেই সত্য, সেবা ও করুণার মতো শাশ্বত মূল্যবোধের কথা উচ্চারণ করেন, যা ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে সকলকে একত্রিত করে।
 
দিল্লির উদ্‌যাপনকে অনন্য করে তুলেছিল যুবসমাজের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ড। অনুষ্ঠানের আগে আয়োজিত আর্ট ফর হারমনি পোস্টার প্রতিযোগিতায় তরুণ শিল্পীরা শান্তির স্বপ্নকে রঙে ফুটিয়ে তোলে। পাশাপাশি “Skills for Interfaith Dialogue” কর্মশালায় ছাত্রছাত্রীরা সহমর্মিতা ও সম্মানজনক কথোপকথনের দক্ষতা অর্জন করে। শান্তিনির্মাণে যুব নেতৃত্বাধীন গোলটেবিল বৈঠকগুলো দেখিয়ে দেয়, সংলাপ যখন কাজে রূপ নেয়, তখন তা সমাজের রূপান্তরে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এগুলোই সেই বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে আন্তধর্মীয় শিক্ষাকে শিল্প, সেবা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
 
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখন আন্তধর্মীয় সংলাপ শান্তি রক্ষার এক কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘ এটি এগিয়ে নিচ্ছে অ্যালায়েন্স অব সিভিলাইজেশনস এবং ইউনেসকোর সংস্কৃতিগত বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে। আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার ফোরাম কেরুকুনান উমাত বেরাগামা স্থানীয় ধর্মীয় সহযোগিতা বাড়াচ্ছে; যুক্তরাজ্যের ইন্টার ফেইথ নেটওয়ার্ক সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা প্রদান করছে; আর নাইজেরিয়ার ইন্টারফেইথ মেডিয়েশন সেন্টার পাস্টর ও ইমামদের সঙ্গে নিয়ে সংঘাতবিধ্বস্ত সমাজ পুনর্গঠনের কাজ করছে। এসব অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য মিলন, পুনর্মিলন ও সামাজিক আস্থার ভিত্তি হতে পারে।
 
বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবদান এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অন্তর্ভুক্তির ইতিহাস, অশোকের সহনশীলতা, আকবরের দীন-ই-ইলাহি, গুরু নানকের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং গান্ধীর আন্তধর্ম প্রার্থনা, ভারতের পরিচয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আজকের বিভাজন প্রবণ বিশ্বে ভারতের সংবিধান যে ভ্রাতৃত্ববোধের কথা বলে, সেটিই দেশের দিশারি। ২০২৫ সালের কনক্লেভ স্পষ্ট করেছে, সম্প্রীতি মানে শুধু সহ্য করা নয়, বরং সক্রিয় সহযোগিতা, যেখানে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও নাগরিক সমাজ শিক্ষা, পরিবেশ ও নারী ক্ষমতায়নে একত্রে কাজ করেন।
 
সম্মেলনে উপস্থিত হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ এবং পার্সি ধর্মের নেতারা
 
বিশ্বব্যাপী তরুণরা এখন শান্তির অন্যতম প্রধান দূত। গবেষণা বলছে, জীবনের শুরুর দিকে আন্তধর্মীয় অভিজ্ঞতা অর্জন সহমর্মিতা বাড়ায় এবং বিদ্বেষ কমায়। GPF ইন্ডিয়ার উদ্যোগ, যেমন ইয়ুথ পিস ক্লাব ও ইন্দো-প্যাসিফিক পিস ফোরাম, এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠে মানুষের ভেতর থেকে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে নয়।
 
বিশ্ব যখন আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি সপ্তাহ ২০২৬-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দিল্লির কনক্লেভ মনে করিয়ে দেয়, যদি সংলাপ অভিন্ন মূল্যবোধে ভিত্তি করে হয়, তবে তা বিভেদ নিরাময় করতে পারে। সেই সঙ্গে এটি আরও দেখায়, আন্তধর্মীয় সহযোগিতা কোনো কল্পনা নয়; পরিচয়-সংঘাত, পরিবেশ সংকট ও সামাজিক ভাঙনের সময়ে এটি বাস্তব প্রয়োজন। ভারতের বসুধৈব কুটুম্বকম দর্শন, যা G20-এর “One Earth, One Family, One Future” থিমেও প্রতিধ্বনিত, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টাকে এক নতুন মাত্রা দেয়।
 
১ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, এই সময়ে বিশ্বব্যাপী মন্দির, মসজিদ, চার্চ, গুরুদ্বার ও বিহার আবারও বন্ধুত্বের আলোয় আলোকিত হবে। সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে শিল্প, সঙ্গীত ও সেবার মাধ্যমে পুনরায় শোনা যাবে সেই বার্তা, শান্তি শুরু হয় শুনতে শেখা হৃদয় থেকে। দিল্লি ও বিশ্বের নানা প্রান্তে দীপ্যমান বিশ্বাসের আলো স্মরণ করিয়ে দেবে, প্রত্যেক ভিন্নতার আড়ালে একই শুভতার অন্বেষণ আমাদের সবাইকে যুক্ত করে।
 
সহমর্মিতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে থাকা এই বিশ্বে ভারতের উদাহরণ এক নৈতিক পথনির্দেশ। এটি দেখায়, সম্প্রীতি কোনো দূরাকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন নয়; বরং প্রতিদিনের অভ্যাসে রূপ নিলে তা বাস্তব হয়ে ওঠে। সব ধর্মের মানুষ যখন এই সপ্তাহে একত্রিত হবেন, তখন পুনরায় উচ্চারিত হবে সেই সহজ সত্যটি, যে সৎ-এর প্রতি ভালোবাসা আমাদের পথচলার দিশা হলে মানবসভ্যতা সত্যিই এক পরিবারে পরিণত হয়। আর এই বার্তাই এক বিভক্ত পৃথিবীতে নতুন আশার আলো জাগিয়ে তোলে।
 
(লেখক অসম সরকারের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিচালক; অসম লোকসেবা কমিশনের প্রাক্তন সভাপতি এবং ‘আওয়াজ–দ্য ভয়েস অসম’-এর প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা)